শীতে তাদের ভাগ্যে জোটেনা গরম কাপড় জবুথুব জগহাটি পাড়ই পাড়ার বাসিন্দরা

0
200

ইমদাদ হোসেন, চুড়ামনকাটি ॥ হঠাৎ যশোরে শৈত্য প্রবাহ বইতে শুরু করেছে। এর যে
শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তার ধাক্কা লেগেছে জেলার
ছিন্নমুল মানুষের মাঝে। আর এই ধাক্কাটা যেন যশোর সদরের
চুড়ামনকাটির জগহাটি বাগদি (পাড়ই) সম্প্রদায়ের
মানুষের কাছে আরো কয়েক গুন বেশি হয়ে ধরা দেয়। এখানে
প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। শীত বেড়ে গেলে
তাদের তা প্রতিরোধ করে থাকার তেমন প্রস্তুতিও নেই। তাই
তাদের শীতের পিঠেপুলি খাওয়ার আনন্দ তো নেই, তাদের কাছে
আছে শুধুই বিষাদের শীত।
ওরা বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষ। দুবেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য
সারাজীবনই সংগ্রাম করেই বেচেঁ থাকে তারা। সমাজের
আর দশজনের ন্যায় সব জায়গায় মিশতে পারেনা তারা।বাপ দাদার
পৈত্রিক পেশা মাছ ধরা। কিন্তু খাল বিল সব সমাজের
প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ার কারণে মাছের পরিবর্তে
শামুক, কুচেঁ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে তারা। এ কথায়
জীবনের মৌলিক অধিকার ছাড়ায় বসবাস করে আসছে যশোর
সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি গ্রামের
সবচেয়ে বড় বাগদি সম্প্রদায়ের (পাড়ই) মানুষ গুলো । শুধু মাত্র
ওরা বাগদি সম্প্রদায়ের (পাড়ই) মানুষ হওয়ায় সমাজ থেকে
অবহেলিত থাকে। এই হাড় কাঁপানো শীতে প্রায় অর্ধলাঙ্গ
মানুষ গুলো বেঁচে থাকার তাগিদে পানিতে গলা ডুবিয়ে
মাছের পরির্বতে শামুক,কুঁচে,ধরে কোন রকম বেঁচে
আছে। শীতে জবুথবু এসব মানুষ গুলোর ভাগ্যে জোটেনা এক
টুকরা গরম কাপড়। খোঁজ নেয় না কোন রাজনৈতি নেতা,বা
সরকারী কোন কর্মকতা । শীত নিবরণের একমাত্র উপায় হল খড়ের
আগুন । সভ্য যুগেও যে মানুষ আদিম যুগের ন্যায় বসবাস
করতে পারে তা এদের না দেখলে কোউ বিশ্বাস করতে পারবে না।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি
গ্রামে বসবাস করে প্রায় ২০০ টি বাগদি সম্প্রদায়ের
(পাড়ই) পরিবার । যে পরিবার গুলোতে বসবাস করে প্রায় ১২০০
মানুষের বসবাস । যশোর সদর উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড়
বাওড়টি জগহাটি গ্রামে হওয়ায় এই পরিবার গুলোর পূর্ব
পুরুষ গন বহু বছর আগ থেকে এখানে তাদের বসবাস শুরু করে
। এই পরিবার গুলোর প্রধান আয়ের উৎস ছিল জগহাটি বাওড়
সহ এলাকার বিভিন্ন খাল বিলে মাছ ধরা জীবিকা নির্বাহ
করা। তাইতো জগহাটি গ্রামের বাওড় পাড় ঘেষে এই পরিবার
গুলো তাদের বসবাসের জন্য ছোট ছোট কুড়ে ঘর বানিয়ে
সেখানেই যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। এক সময়
তারা এই বাওড় থেকে মাছ ধরে এলাকার বিভিন্ন হাট বাজারে
বিক্রি করে ভাল ভাবেই জীবন জীবিকা নির্বাহ করতো । কালের
বির্বতে বিভিন্ন ক্ষমার লোভী মানুষ গুলোর নজর পড়ে এই
বাওড়ের দিকে । তাছাড়া এলাকার খাল বিলে পানি না থাকা এবং
সেখানে প্রভাবশালীরা মাছ চাষ শুরু করায় এই বাগদি
সম্প্রদায়ের কপাল পোড়ে । বাওড়ে মাছ ধরতে না পেরে ক্ষুধার
যন্ত্রনায় তারা নেমে পড়ে জীবন যুদ্ধে। বেচে থাকার তাগিদে
তারা আদি পেশা মাছ ধরা ছেড়ে বেছে নেয় শামুক,
কুঁচে,ধরে জীবন চলার মত পেশা।
সরেজমিন জগহাটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, কাক
ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পযর্ন্ত পুরুষের পাশাপাশি নারীরা
এলাকার বিভিন্ন খাল বিলে এই প্রচন্ড শীতে গলা ডুবিয়ে
ডুবিয়ে শামুক সহ কুঁচে ধরে বাড়িতে আনছে । পরে সে
গুলো বিত্রিু করে নিজেদের খাবার যোগাড় করছে । যেটা
রীতিমত অনেকটা যুদ্ধের মত। শীত আসলে এই পল্লীর মানুষ
গুলোর দুঃখের শেষ থাকে না । শীতের কাপড়ের অভাবে তারা রাত
জেগে খড়ের আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবরণের চেষ্ঠা করে থাকে ।
হরবালা (৬৫)নামের এক মহিলা মনের কষ্ঠে বলেন, সরকার আসে
সরকার যান শুধু পরির্বতন ঘটেনা আমাদের ভাগ্যের । তিনি
আরো বলেন, ভোটের সময় আসলে রাজনৈতিক নেতারা
আমাদের ভাগ্যের পরির্বতনের কথা বলে ভোট লুফে নেয় । এর পর
তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না ।
হারান (৭০) জানায়, বাওড়পাড়ে আমরা ছিন্নভিন্ন ভাবে খড়ের
ঘর তৈরি করে বসবাস করি।যা শীতের সময় বসবাসের যোগ্য
না। শীতে আমাদের শিশুসহ বৃদ্ধদের নিয়ে কষ্ট বেশি হয়।
আবার অনেক মহিলারা বাওড় থেকে মাছ কিনে গ্রামে
গ্রামে গিয়ে বিক্রি করে চাল কিনে বাড়িতে নিয়ে যায় ।
সারা দিন যে মানুষ গুলো খাদ্যর জন্য যুদ্ধ করে বাড়িতে ফিরে
আবার নতুন করে তাদের শুরু করতে হয় নতুন যুদ্ধ । রাতে এই
হাড় কাঁপানো শীতে ঘুমানোর পরিবর্তে খড়ের আগুন
জ্বালিয়ে রাত জেগে থাকতে হয় । মালতি রানী জানায়, শীত
নিবরণের জন্য আগুন জ্বালিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে
তারা শীতে রীতিমত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে । মন কষ্ট নিয়ে
একাধিক ব্যক্তি জানান, পত্রিকায় লিখে কি লাভ হবে । বহু বার
তো লিখলেন আমাদের ভাগ্যের কোন পরির্বতন হয় না। সমাজের
বিত্তমানদের নিকট তাদের প্রত্যাশা শীতে তাদের পরিবারের
পাশে দাড়ানোর জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here