সেদিন কেঁদেছিল পাঁচ গ্রামের মানুষ

0
124

হঠাৎ যেনো নীরবতা স্তব্ধ করে দিয়েছিল যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের যাদবপুর গ্রামটিকে। গ্রামের মানুষ যেনো মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। দুর্ঘটনায় যমজ দুই শিশু সন্তানসহ একই পরিবারের ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর কোনো শান্তনা গ্রামবাসী সেদিন খুজে পাইনি। দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ছুঁয়ে গিয়েছিল মানুষের হৃদয়। করুন এ দৃশ্যে চোখের পানি সেদিন কেউ ধরে রাখতে পারেনি।
যাদবপুরের সেই শোক ছড়িয়ে পড়েছিল বাঘারপাড়া উপজেলার আরও দুটি এবং যশোর সদর উপজেলার দুটিসহ মোট পাঁচটি গ্রামে। এসব গ্রামের আটজন মানুষ চোখের নিমেষে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছিল। সেদিন থেকে হারিয়ে গিয়েছে তাদের হাসিখুশি পরিবারগুলোর সব আনন্দ। স্বজন হারানো মানুষগুলোর চোখে শুধুই শূন্যতা আর শোকের কাতরতা। আজও হাসান-হোসেনের মা তাঁর নাড়ি ছেঁড়া ধন দুই শিশুকে খুজে ফিরে।
২০২৩ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখ শুক্রবার সন্ধ্যায় যশোর-মাগুরা সড়কের লেবুতলায় মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। শুক্রবার সন্ধ্যায় যশোর থেকে ছেড়ে যাওয়া মাগুরামুখী যাত্রীবাহী বাস লেবুতলা এলাকার তেঁতুলতলা বাজারে স্পিডব্রেকারের সাথে ধাক্কা খায়। এরপর বাসটি যাত্রীবাহী ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হয়। পরে আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে জমজ হাসান-হোসেন ছাড়াও তাদের পরিবারের আরও তিনজন ছিল। তারা হলো নানি মাহিমা, মাহিমার বোন রাহিমা এবং রাহিমার মেয়ে জেবা তাহেরা। হাসান-হোসেন যাদবপুর গ্রামের হেলাল মুন্সির ছেলে। তাদের নানি মাহিমা একই গ্রামের বাবুল মুন্সির স্ত্রী। মাহিমার বোন রাহিমা একই উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের সেকেন্দারপুর গ্রামের সাইদুল ইসলামের স্ত্রী এবং রাহিমার শিশুকন্যা জেবা। দুর্ঘটনার মাস চারেক আগে সাইদুল সংসারের সাচ্ছন্দ ফেরাতে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন।
দুর্ঘটনায় নিহত অপর তিনজন হলেন ইজিবাইক চালক বন্দবিলা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামের ওবায়দুর রহমানের ছেলে আবু মুসা (১৭) এবং বাইকের আরো দুইজন যাত্রী সদর উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামের মারুফ হোসেন মুন্না ও সুলতানপুর গ্রামের সাইদুল ইসলামের ছেলে ইমরান। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন হাসান-হোসেনের মা সোনিয়া এবং বোন খাদিজা। বোন খাদিজার অবস্থা মারাত্মক না হলেও মা সোনিয়ার অবস্থা ছিল গুরতর। সোনিয়া তার তিন সন্তান ও মা খালাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে যশোর শহরে যাচ্ছিল ইজিবাইক করে।
দুর্ঘটনার একবছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। কিন্তু সোনিয়া খাতুন একপর্যন্ত সুস্থ হয়ে ওঠেনি। এপর্যন্ত তার শরীরে দু’বার অস্ত্রপচার করা হয়েছে। একটি চোখ সম্পূর্ন নষ্ট হয়ে গেছে। বাকিটা দিয়ে খুব একটা ভালো দেখতে পায়না। ডাক্তার বলছেন এই মাসের মধ্যে চোখে অস্ত্রপচার করা না হলে এ চোখটিও নষ্ট হয়ে যাবে। খরচ লাগবে প্রায় ৬০হাজার টাকা।
দুই সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক হেলাল মুন্সি বলেন, আমি সাভারের হেমায়েতপুর ট্যানারির শ্রমিক। সেদিনের দুর্ঘটনা আমার জীবন থেকে সব আনান্দ কেড়ে নিয়েছে। স্ত্রীকে আজ পর্যন্ত সুস্থ করতে পারলাম না। গ্রামে যেটুকু জায়গা জমি ছিল তা বিক্রি করে মেয়ে ও স্ত্রীকে চিকিৎসা করিয়েছি। মেয়ে সুস্থ হলেও স্ত্রীকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছি। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার বলেছেন এই মাসের মধ্যে সোনিয়ার চোখে অস্ত্রপচার করতে হবে। কিন্তু খরচের টাকা এখন পর্যন্ত জোগাড় করতে পারেনি। মামলা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেই সময় কিন্তু এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও চাচাদের কথামত আর হয়ে ওঠেনি। পরে ঘাতক বাসের মালিকের সাথে তিনলাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হলেও হেলাল মুন্সি পেয়েছিলেন একলাখ টাকা। বাকি টাকা মাতব্বারদের পকেটে।
মাহিমার স্বামী ঢাকার একটি কোম্পানীতে চাকরী করেন। স্ত্রী ও যজম দুই নাতির স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন। কথা হলে তিনি বলেন, এলাকায় বেশী একটা যায় না। কাজের ফাঁকে ওদের কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়। অজান্তেই চোখ ভিজে যায়। ভয়ংকর কষ্টের কথা কাউকে বলে বোঝানো যায় না। একমাত্র দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারই জানেন।
দাদি রেণুকা বেগমের বিলাপ আজও থামেনি। বিলাপ করতে থাকেন ‘তুমরা আমার মণিগের আইনে দ্যাও। হাসান-হোসেন ছিল আমার পরাণ।
পরিবারটিকে শান্তনা দিতে সেদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিল সাধারণ মানুষ। এসেছিলেন রাজনৈতকি নেতা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতারাও।
যাদবপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত যাদবপুর মুন্সীবাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় জমজ ও তাদের নানিকে। সেকেন্দারপুরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় রাহিমা ও তার শিশুকন্যাকে। ইজিবাইক চালক আবু মুসাকে মথুরাপুর গ্রামে দাফন করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here