জেলা প্রতিনিধি, যশোর : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান বলেছেন, শোষন ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিনা কারনে নিজেদের মধ্যে কাঁদা ছোড়াছুড়ি করা যাবে না। স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তাদের দোসররা এখনো দেশের সর্বত্র সক্রিয়। সময় সুযোগ পেলেই তারা তাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহি:প্রকাশ করে দেশকে ফের অশান্ত করে তুলবেন। গত ১৫ বছরে এই পতিত স্বৈরাচার দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টর থেকে শুরু করে সকল ব্যবসায়ী ও শিক্ষা সেক্টরকে ধ্বংস করেছে। দেশে কোন আইনের শাষন ছিলো না। বিচার ব্যবস্থা ন্যাক্কারজনক ভাবে দলীয় করণ করা হয়েছিলো। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল। দেশকে একটি দেশের গরদ রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতাকে ভারত তাদের বিজয় বলে গর্ব করে। অথচ বিগত ১৫ বছর যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করেছিলো, তারা কোন দিন এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি। বরং তারা ভারতীয়দের বিজয় দিবসকে স্বাগত জানিয়েছেন। ’২৪ জুলাই আগষ্ট্রের বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ সত্যিকারের স্বাধীন হয়েছে। শত শত শহীদের বুকের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই বিজয়কে কোন ক্রমেই কলঙ্কিত করতে দেবো না। তার জন্য প্রয়োজন সৎ মানুষের শাষন। দেশ থেকে সকল প্রকার বৈষম্য, ঘুষ, দূর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চিরতরে বন্ধ করা। তার জন্য সামনে কঠিন সংগ্রামের জন্য দলের সকল কর্মী, সমর্থক ও নেতৃবৃন্দকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানান। শুক্রবার সকাল ১১ টায় যশোর ঈদগাহ ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আমিরে জামায়াত ডাঃ শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আবহমান কাল থেকে আমাদের এই দেশটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সকল ধর্মের মানুষ এখানে আমরা মিলেমিশে বসবাস করি। এমন একটি দেশকে বিগত দিনে যারা শাসন করেছেন একটানা সাড়ে ১৫ বছর, তারা মনের মতো করে সাজাতে পারেননি। তারা দেশকে না সাজিয়ে নিজেদের সাজিয়েছে। দেশের মানুষের হাতে কাজ তুলে দেয়ার পরিবর্তে দেশের মানুষের রিজিক তারা তুলে নিয়েছে। লাখো বেকারের মিছিলে জনগণ ছিল পিষ্ট। এই সর্বনাশের জন্য বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার দায়ী। তাদের এই ব্যর্থতার কারনে দেশের তরুন ছাত্র সমাজ যখন বৈষম্য দূর করার দাবিতে রাস্তায় নামলো তখন সরকার তার হেলমেট বাহিনী, গোন্ডা বাহিনী ও পেটোয়া পুলিশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে শত শত ছাত্র জনতাকে গুলি করে হত্যা করলো।
তিনি বলেন, শিাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের হাত থেকে কলম কেড়ে নিয়ে গুণ্ডাদের মতো হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে। এদেশের মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের অর্জিত টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন তারা নির্বাচনে আসবে কি? আমি বলি- যারা গণহত্যা করেছে, গদিতে থাকার জন্য দেশের মানুষের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়ে দেশের মানুষের বুকে গুলি ছুড়েছে। তারা কি এই দেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে? স্বৈরাচার পালিয়ে গেলেও তারা দেশের মানুষকে শান্তি দিতে চাচ্ছে না। এই সমাজকে, দেশকে অস্থির করার জন্য ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা এ দেশকে ভালোবাসি, এদেশকে গড়তে চাই। এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে চাই যেখানে দুর্নীতিবাজ দখলদারদের অস্তিত্ব থাকবে না। যে সমাজে আমাদের মা-বোনেরা ইজ্জতের সঙ্গে গৃহে এবং বাহিরে সমস্ত জায়গায় চলাফেরা করতে পারবে। যেই সমাজে যোগ্যতা অনুযায়ী যুবকরা কাজ করতে চায়। সেই সমাজ আমরা হাতে হাত রেখে গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ্। এমন একটি সমাজ আমরা বাংলাদেশে কায়েম করতে চাই। ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের দরজায় যেয়ে মানুষকে কাঁদতে হবে না। বরং আদালত দায়িত্ব নিয়ে মানুষকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিবে। সেই সমাজ গড়তে চাই। এ জন্য আপনাদেও আরেকবার তৈরি থাকতে হবে বৃহত্তর কোরবানির জন্য, জিহাদের জন্য। মানুষের মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সাম্যের দিক থেকে, ন্যায় বিচারের দিক থেকে একটি দেশ এবং জাতি গঠন না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে- ইনশাল্লাহ্। ন্যায়সঙ্গত কাজে সকলকে পাশে থাকা এবং সমর্থন দেয়ার আহবান জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ দিন রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার জুডিশিয়াল কিলিং এর মাধ্যমে আমাদের দলের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে ফাঁসীতে হত্যা করে জামায়াতকে নেতৃত্ব শুন্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ জামায়াতে ইসলামী দেশের রাজনীতিতে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। আর সেই ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগ আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মনে রাখবেন অহংকার পতনের মুল। রাজনীতি হচ্ছে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আত্ন সংগ্রাম। জামায়াতের প্রতিটি কর্মী সমর্থক সেই সংগ্রামে লিপ্ত। দখলবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাস মুক্ত আগামীর বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরাজিত শত্রুরা কিন্তু চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চালিয়েই যাচ্ছে। তাদের কোন উস্কানীতে পা দেওয়া চলবে না। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লীলাভূমি। এই সম্প্রীতি আমরা নষ্ট হতে দেব না।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সাফ বলেছি-আমরা মেজরিটি-মাইনোরিটি মানি না। এদেশে যাদের জন্ম হয়েছে তারা সবাই সমমর্যাদাবান গর্বিত নাগরিক। ছোট্ট একটা দেশ, এত ভাগ কিসের আবার। জাতীয় স্বার্থে আমরা সবাই এক। কারণ দেশ বাঁচলে আমিও বাঁচব, সবাই বাঁচবে। অশান্তি হলে সবাইকে তা ভোগ করতে হবে। আমরা একটা শান্তিপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে জামায়াত ইসলামী সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে। বিগত ১৩ বছর সারাদেশে আমাদের অফিস সিলগালা ছিল। আমাদের দলকে নির্বাচন কমিশন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আমাদের প্রতীক ও নিবন্ধন কেঁড়ে নেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই চাপ আর কোনো দল পায়নি। ৫ আগস্টের আগে দেশে দখলদারি-চাঁদাবাজি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শুধু ফ্যাগ বদল হয়েছে; ডান হাত থেকে বাম হাতে গেছে।’ এই অবস্থা দেশের মানুষ মেনে নিবে না। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে দেশের মানুষকে তিনি আহবান জানান। বৈষম্যহীন, শোষনহীন, বঞ্চনাহীন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরীতে আগামী নির্বাচনে তিনি সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য উপস্থিত সকলের সম্মতি আদায় করেন। যশোর জেলার আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মী সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক,মাওলানা আজিজুর রহমান, অধ্যাপক আলী আজম,এ্যাড. গাজী এনামুল হক, আব্দুল কাদের,এ বিএম বাকির,আতাউর রহমান বাচ্চু,ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন ফকির, শহীদ আব্দুল্লাহর পিতা আব্দুল জব্বার, মাওলানা হাবিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল আজিজ,মাওলানা আরশাদুল ইসলাম, অধ্যাপক মুক্তার আলী,, শিবির নেতা মোস্তফা কামাল, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আশিকুজ্জামান প্রমুখ ।















