রায়হান হোসেন, চৌগাছা পৌর প্রতিনিধি : খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তৃতীয়বারের মতো যশোরের চৌগাছায় তিনদিনব্যাপী গুড়মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বুধবার (১৫ জানুয়ারি) সকালে জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম এই মেলার উদ্বোধন করেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গাছিদের নিয়ে ১৫ জানুয়ারি বুধবার থেকে থেকে ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার পর্যন্ত উপজেলা চত্ত্বরে এই মেলা চলবে। বৈশাখী মঞ্চে অনুষ্ঠিত গুড় মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন যশোরের জেলা প্রশাসক আজাহারুল ইসলাম। জেলা প্রশাসক বলেন, ঐতিহ্যবাহী যশোরের মতো ভাল মানের গুড় অন্য অঞ্চলে উৎপাদিত হয়না। আমরা খেজুর গুড় দিয়ে যশোরকে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করতে চাই। বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে গুড় উৎপাদনের পর প্যাকেটজাত করে এর বহুমুখী ব্যবহার সম্ভব। তিনি বলেন, উদ্যোক্তা তৈরীর বড় ধরনের এক প্লাটফর্ম যশোরের এই খেজুর গুড়। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, লেখাপড়া শেষ করার পর সবাইকে সরকারি চাকরি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষিত তরুন প্রজন্মকে আধুনিকতার সংস্পর্শ নিয়ে এই পেশায় আকৃষ্ট করা গেলে তারা প্রত্যেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে পারবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুষ্মিতা সাহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সহ-সভাপতি নূর-ইসলাম, যশোরের সহকারী কমিশনার আব্দুল আহাদ, চৌগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাসমিন জাহান, চৌগাছা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউর রহমান, চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি কামাল হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাব্বির হুসাইন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম, সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান ও উপজেলা জামায়াতের আমির মাও. গোলাম মোরশেদ। বিশেষ অতিথি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, যশোরের খেঁজুর রস ও গুড়ের ঐতিহ্য শতশত বছরের পুরাতন। তিনি বলেন, যশোর জেলা ধরেই খেঁজুরের রস গুড় উৎপাদিত হলেও রস গুড় উৎপাদনে চৌগাছার রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
উল্লেখ্য তৎকালীন বৃটিশ ভারতে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইংরেজ ব্যাক সাহেব পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের ধোবা নামক স্থানে চিনির কল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ক্ষতির মুখে কোম্পানী বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। ঐ সময় কলকাতার গ্যাডস্টোন উইলি অ্যান্ড কোং যশোরের চৌগাছায় এসে চিনির কল স্থাপন করেন। একই সময় ১৮৬১ সালে নিউহাউজ সাহেব ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদের সংযোগস্থল চৌগাছার তাহেরপুরে একটি চিনির কল স্থাপন করেন। পর্যায়ক্রমে এ অঞ্চলে বেশ কিছু চিনির কল প্রতিষ্ঠিত হয়। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোস্পানী ইউরোপে চিনি রপ্তানী শুরু করে। কালের বিবর্তনে যশোর জেলাসহ চৌগাছার খেঁজুর গুড়ের ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। খেঁজুর গুড়ের সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে এবং দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক বাজারে গুড়ের চাহিদা বাড়াতে উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায় বক্তারা।
এদিন ঘুরে দেখা যায়, মেলায় মোট ১২ টি স্টল বসেছে। বেশিরভাগ স্টলেই গাছিদের উৎপাদিত খাটি গুড় ও পাটালি বিক্রি করতে দেখা গেছে। কিছু স্টলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে গুড়ের তৈরী নানা ধরনের মনকাড়া পিঠা-পুলি। এদিকে কিছুটা দুরেই গাছিরা তাপালে করে রস জালিয়ে তৈরী করছেন গুড়। থেমে নেই স্কাউটস সদস্যরাও। তাদের রস জালিয়ে গুড় করার পর দর্শনার্থীরাও সে গুড়ের স্বাদ নিতে খেজুর পাতা নিয়ে তাপালের পাশে বসে আছে।
অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, সংবাদকর্মী ও স্থানীয় গন্যমান্যসহ গাছিরা উপস্থিত ছিলেন।















