হেলাল উদ্দিন : একদিকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল মানুষ। এতে বিপাকে পড়েছেন
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। শ্রমজীবী মানুষের তো দেয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। এরসাথে এখন যুক্ত
হয়েছে শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি। বাধাই করা খাতা, দিস্তা কাগজ, কলম, পেন্সিল, রং পেন্সিল, স্কেল,
জ্যামিতি বক্স, সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর, বইসহ এহেন কোন শিক্ষা উপকরণ নেই যেটির দাম
বাড়েনি। এ নিয়ে অভিভাবকমহলে চলছে হা-হুতাশ। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারের
কয়েকটি শিক্ষা উপকরণের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের
সাথে জড়িত বেশিরভাগ পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। এমন অবস্থায় সন্তানদের
লেখাপড়া চালিয়ে নিতে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খাবার-দাবার কিংবা
অন্যান্য খরচ থেকে কাটছাট করে কোন মতে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছেন। আর
নিম্নবিত্তদের কারো কারো সন্তানের রেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রমই হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
বলছেন- বই খাতার পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০-৩৫
শতাংশ। মানভেদে খাতার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা। কলমের দাম বেড়েছে ডজনপ্রতি ১০
থেকে ১৫ টাকা। মার্কিং করার ছোট কালার কলমের দাম ৫ থেকে ৭ টাকা বেড়েছে। আগে যে
প্রাকটিক্যাল খাতা ৮০ থেকে ৮৫ টাকা ছিল, এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। স্টিলের স্কেল ১০
টাকা ও প্লাস্টিকের স্কেলের দাম বেড়েছে ৫ টাকা। জ্যামিতি বক্সের দামও বেড়েছে ২৫ থেকে ৩৫
টাকা। বাজারে ফটোকপির চার্জও বেড়েছে। আগে এক পৃষ্ঠা ফটোকপি করতে খরচ হতো দেড়
থেকে দুই টাকা। এখন খরচ হয় তিন টাকা। প্রতিটি প্লাস্টিক ফাইলের দাম ৫ থেকে ৭ টাকা
বেড়েছে। প্রতি ডজন পেনসিল ও রাবার ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে
অভিভাবকদের। রাজগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তুরিন জানায়- আমাদের
প্রতিমাসেই গণিত করতে অন্তত ২টা খাতা লাগে। যে খাতাটা আগে ৩০ টাকায় কিনতাম
এখন তা কিনতে লাগে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বইপুস্তকের দাম তো বাড়ছেই। শুধু কলমের মূল্যটাই
আগের মতো আছে। বাকি সবকিছুরই দাম বেড়েছে। এদিকে পিতার সামান্য রোজগারে
নিজেদের সংসারই চলে না। তার উপর আমার লেখাাপড়ার খরচ চালাতে হয়। রাজগঞ্জ হাইস্কুলে
কয়েকজন শিক্ষার্থীরা বলেন- দাম বেশি বলে সময়মতো বই খাতা কেনা হয় না। মোছাঃ লাকি
খাতুন নামের একজন অভিভাবক বলেন- আমার ছেলে নবম শ্রেণিতে আর মেয়েটা ১ম শ্রেণিতে
পড়ে। ওদের প্রতিমাসে অনেক খাতার দরকার হয়। আগে বিভিন্ন কোম্পানির বাইন্ডিং খাতা
কিনে দিতাম। দাম বৃদ্ধির কারণে খাতা কেনা কমিয়ে দিয়েছি। এখন দিস্তা খাতাই বেশি কিনে
দিচ্ছি। সেটারও দাম বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে। শুধু খাতাই নয়, প্রতিটি শিক্ষা-উপকরণেরই দাম
বেড়েছে। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেই এখন হিমশিম খাচ্ছি। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক
ব্যক্তির সাথে আলাপকরে জানা গেছে- শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া মানে অবশ্যই শিক্ষার উপর
নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ৭ম-৮ম শ্রেণি পার করেই অনেক শিক্ষার্থীই ঝরে পড়েছে। যাদের
অভিভাবক চাকরীজীবি তাদের সন্তান ছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধির বাজারে লেখাপড়াই টিকে থাকতে
পারছে না। শিক্ষা খাতে ব্যয়ও আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবার তাদের
সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহনে অনেকটাই অক্ষম হয়ে পড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-
রাজগঞ্জে এফোর ৮০ গ্রামের একরিম কাগজ ৪৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লিগ্যাল সাইজের একরিম
কাগজ প্রায় ৬০০ টাকা, দিস্তা কাগজ একরিম ৪৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর বাইন্ডিং খাতা
ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। রাজগঞ্জ এলাকার আরও একজন নারী
অভিভাবক বলেন- আমার স্বামী ছোট খাটো একটি চাকুরী করেন। আমার দুই মেয়ের বড় মেয়ে
পড়ে এডাসের ৫ম শ্রেণীতে, আর দ্বিতীয় মেয়ে ১ম শ্রেণীতে। আমার স্বামী যা বেতন পাই,
তাতে আমাদের সংসারই ঠিক মত চলে না। যদি খাতা কলমের দাম এভাবে বাড়ে তাহলে কীভাবে ক্রয়
করবো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছায়ে গেছে সন্তানদের চাহিদা পূরন করতে পারছে না
অভিভাবকরা। আর যাদের দুই চারজন ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে তাদের যে কী অবস্থা ভাবতেও মাথা
ঘুরে যায়! নিত্যদিনের দ্রব্যমূল্য, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ এসব জোগাড় করতে নিম্ন আয়ের
অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। চিন্তিত সন্তানের শিক্ষা ভবিষ্যৎ নিয়ে। অভিভাবকদের
দাবি- শিক্ষা উপকরণের মূল্য কমানো। তা না হলে অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে
যাবে।















