মোস্তাফিজুর রহমান আপেল,কোটচাঁদপুর প্রতিনিধি : ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জুড়ে রাতে মাটি কাটার মহাউৎসব চলছে। উপজেলা প্রশাসনে পক্ষ থেকে জেল জরিমানা করেও কোনো প্রকার দমানো যাচ্ছে না তাদের। এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাম অঞ্চলের মানুষের। দায়িত্বরত ইউনিয়ন সহকারী ভুমি কর্মকর্তাদের একাধিক বার মাটি কাটার বিষয় অবগত করলেও কোনো প্রকার ব্যাবস্থা নেয়নি তারা। উল্টো মাটি ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের ভোমরাডাঙ্গা গ্রাম পুকুর সংস্কারের নামে রাত ভোর মাস ব্যাপি ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ইট ভাটায় বিক্রি করছেন ওই গ্রামের হাসান ও সাইফুল। ডিসি অফিস থেকে পুকুর সংস্করের অনুমতি নিয়ে দোড়া ইউনিয়নের সুয়াদি গ্রামের পুকুর সংস্কার করার পাশাপাশি ট্রাক্টর বোঝাই করে ইটভাটা সহ বিভিন্ন জায়গায় মাটি বিক্রি করছেন পাকা ও সুয়াদি এলাকার সাইফুল, বিপুল, সোহেল, মনা, পারভেজ, মিজান, উকিল সহ আরো অনেকে। পাশেই পুকুর সংস্কার করছেন সাফদারপুর এসডি কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি কোনো অনুমতি নেননি। সপ্তাহ ব্যাপি মাটি কেটে বিক্রি করছেন ইটভাটা সহ বিভিন্ন জায়গায়। তিনি জানান বিভিন্ন সিস্টেম করে কাজ চালাচ্ছেন। কুশান ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের পুকুর থেকে মাটি বিক্রি করছে সাইদুর রহমান। ডিসি অফিসের অনুমতি নিয়ে ভেকু দিয়ে কাঁঠালিয়া গ্রামের পুকুর থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছেন এলাঙ্গী ইউনিয়ন ইউপি সদস্য আব্দুল হাকিম ও আইয়ুব। সাফদারপুর ইউনিয়নের চতুরপুর গ্রামে ভেকু দিয়ে বালি কাটছেন সিদ্দিক নামে একজন। তিনিও বিভিন্ন জায়গা ম্যানেজ করে কাটছেন বলে জানান। দোড়া ইউনিয়নের বকুল সিটি পার্কের ভিতরে ড্রেজার মেশিন দিয়ে পুকুর থেকে বালি তুলে ভেকু দিয়ে কেটে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছেন শাহজাহান আলী। দোড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আমিন উদ্দিন অনুমতি নিয়ে পুকুর সংস্কার করছেন বলে দাবি তার। তবে অভিযোগ রয়েছে তিনিও মাটি বিক্রি করছেন বাইরে। দিনের বেলায় দেখা যায় দুই এক জনকে লেবার দিয়ে হেডলোডে ট্রাক্টরের টলি বোঝাই করে কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে নিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে। তবে রাত হলেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মাটি কাটা সিন্ডিকেটের সদস্যরা। রাত ১০টার থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত অবৈধভাবে চলে মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে এভাবে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে কৃষিজমির উপরিভাগের ও পুকুর সংস্করের নামে মাটি কেটে নিচ্ছেন চক্রের সদস্যরা। উর্বর মাটি ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থান ভরাটের কাজে বিক্রি করছেন তারা। এসব পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত গাড়িতে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ পাকা সড়ক সহ হাইওয়ে সড়ক।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা করা হয়েছে । মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার জন্য। এরপর দিনের বেলায় চক্রের সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থাকলেও রাতের বেলায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন কৃষক। এসব ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। পাট, পেঁয়াজ, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, ধানসহ নানা ধরনের ফসলের আবাদ হয়। তবে মাটি কেটে নেওয়ায় প্রতি বছর আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে কৃষকের দীর্ষস্থায়ী ক্ষতি হলেও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন মাটি ব্যবসায়ীরা। সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার এলাঙ্গী গ্রামের ধানের জমি থেকে লেবার দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। জমির মালিক রাঙ্গিয়ারপুতা গ্রামের স্কুল শিক্ষকের ভাষ্য, তার পাশের জমির মাটি কেটে বিক্রি করার কারণে তার জমি উঁচু হয়ে গিয়েছে। তাই মাটি কাটছে। তিনি ডিসি অফিস থেকে অনুমোদন নেননি বলে জানিয়েছেন। ৪ থেকে ৬টি ট্রাক্টরে এসব পরিবহনের কাজ হচ্ছে।
জায়গাটিতে আগে সমতল জমি ছিল বলে জানান গ্রামের কৃষক রফিক হোসেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গ্রামের লোকজন বাধা দিয়ে কি করবে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের সহযোগিতা করাছে। পর্যায়ক্রমে আশপাশের সব জমির মাটি কাটতে হবে। তা না হলে উঁচু নিচু জমিতে আবাদ হবে না। ডিসি অফিস থেকে অনুমোদন না নিয়ে মাটি কাটার কাজ করছেন পৌর এলাকার নাওদা গ্রামের লাল চাঁন। তিনি বলেন, মাটি কাটতে বলেছে জমির মালিক। আমি লেবার ঠিক করে মাটি কাটছি। তবে এ মাটি ইটভাটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কপোতাক্ষ নদ ক্ষননের পাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলায় কয়েকটি শক্তিশালী মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা দরিদ্র কৃষককে নানান প্রলোভন দেখিয়ে উর্বর অংশের মাটি কিনে নিচ্ছেন। অসচেতনতায় অনেকে নগদ অর্থ পেতে বিক্রি করছেন এসব মাটি। কৃষিজমি থেকে কেটে নেওয়া মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রলি। এতে গ্রামীণ সড়কে খানাখন্দ তৈরি হচ্ছে। একপর্যায়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সড়ক। ট্রলি চলাচল করায় আবাদি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ট্রাক্টরের লাইট জ্বালিয়ে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত মাটি কাটে। সাত-আটটি ট্রাক্টর পরিবহনের কাজ করে। এ বিষয় ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল এর কাছে মুঠো ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুমতি বাদে মাটি কাটার কোন সুযোগ নেই। মাটি কাটতে হলে অনুমতি নিতে হবে। কোথায় কোথায় কাটছে
নির্দিষ্ট স্থানের তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন।ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।















