মৌসুম জুড়েই নির্ঘুম রাত কাটে ওদের দেশের ধান মাড়াই মেশিনের চালকের স্থানে কালীগঞ্জ

0
85

মিশন আলী,স্টাফ রিপোটার,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : এক সময়ে সারি বেধে গরু ঘুরিয়ে অর্থাৎ মলন মলে কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতেন।
আর বিছালী (গো-খাদ্য) পেতে পাকা ধানের মুঠো আছড়িয়ে ধান সংগ্রহ
করতেন। কিন্ত এগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন পদ্ধতি। যা কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির
ছোঁয়া লেগে খুব সহজ হয়ে গেছে। এখনকার দিনে মটরচালিত মাড়াই মেশিনের
সাহায্যে ধান মাড়াই করা হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমছে অপরদিকে
সময়েরও সাশ্রয় হচ্ছে। আর মাড়াইয়ের এ মেশিন তৈরীতে সারাদেশের মধ্যে
কুমিল্লার পরেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের স্থান। এখন আমন সংগ্রহের সময়ে
এখানকার কারিগরদের তৈরীকৃত ধান মাড়াইয়ের মেশিন যাচ্ছে ফরিদপুর, মাদারীপুর,
মাগুরা, রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দক্ষিণবঙ্গসহ
দেশের অধিকাংশ জেলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়,কালীগঞ্জ শহরের বিভিন্ন সড়কের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা
স্থানগুলোতে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো ওয়ার্কসপ। যেগুলোর কারখানার কারিগরেরা ধান
মাড়াইয়ের মেশিন তৈরীতে মহাব্যস্ত। তাদের মধ্যে কেউ কাঠের বডি তৈরী করছেন,
কেউ লেদ মেশিনে ফেলে ঝালাইয়ের কাজ ও মেশিনের সব অংশ সেট করছেন,আবার
কেউবা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ত্যাড়া বাকা ঠিক করছেন। আর সর্বশেষ নিপূন
হাতে কেউ কেউ করছেন রঙের কাজ। অপরদিকে কারখানার মালিক কখনও মুঠোফোনে

লেনদেন সারছেন আবার চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে ঘুরে কারিগরদের কাজ দেখছেন
পাশাপাশি নির্দেশনা দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে কেউ অল্প সময়ের জন্যও স্থির নেই।
অবস্থাটা এমন চারপাশে যেন কাজের প্রতিযোগীতা চলছে। কারখানায় অবস্থান
করার সময়টাতে ঠুংঠাং শব্দে কান মাথা ঝালাপালা অবস্থার সৃষ্টি হয়।
একাধিক কারিগর জানান, সারাবছর তারা কারখানায় কাজ করেন। তবে আমন ও
বোরো ধান ঘরে তোলার সময়ে কাজের ব্যস্ততায় তাদের খাওয়া ঘুম বন্ধের উপক্রম হয়।
তারা বলেন, দেশের সব জেলাতেই ধান উৎপাদন হয়। কিন্ত সব জেলাতে ধান মাড়াইয়ের
মেশিন তৈরী হয় না। সে দিক দিয়ে সারাদেশের মধ্যে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ বিশেষ
স্থান দখল করে আছে। কারন এখানকার কারিগরদের তৈরীকৃত ধান মাড়াইয়ের মেশিন
অত্যন্ত মজবুত টেকসই। এক সময় তারাও এ মেশিন তৈরী করতে পারতেন না। ৩০-৩৫
বছর আগে ধান মাড়াই মৌসুমের সময় কয়েকজন কারিগরকে বেতন চুক্তিতে এনে
কাজ করাতেন। তাদের কাছ থেকে স্থানীয় কারিগরেরাও সব কাজ ভালোভাবে শিখে
নেন। তারা আরও বলেন, সারাদেশের মধ্যে এখনও কুমিল্লা সেরা তবে পরেই কালীগঞ্জের
স্থান।
চন্দন বিশ^াস নামের এক কারিগর জানান, প্রায় ২৮ বছর ধরে ওয়ার্কসপে কাজ
করেন। দিন যত যাচ্ছে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরী হচ্ছে। কারখানায়
সারাবছর তারা ধান মাড়াই মেশিনের অংশ বিশেষ তৈরী করেন রাখেন। আর মৌসুম
আসলেই এগুলো শুধুমাত্র সেটিং শেষে আকর্ষনীয় রঙ করে ছেড়ে দেন। যে কারনে তখন
বাইরের জেলাসহ দুর-দরান্তে দ্রুত এগুলো পাঠাতে পারেন। তিনি আরও বলেন, একটি
উপজেলা শহর হলেও কুমিল্লার পরেই কালীগঞ্জের ধান মাড়াইয়ের মেশিনের সারাদেশের
মধ্যে বিশেষ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এ মেশিন কিনে
তাদের এলাকায় নিয়ে বিক্রি করে থাকেন।
দিশারী কাঠহোলা এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের সত্ত্বাধিকারী আলহাজ¦ লুৎফর
রহমান জানান, ধানঝাড়া মেশিনের বাজারে সারাদেশের মধ্যে ঝিনাইদহের
কালীগঞ্জের মেশিনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর কারন এখানকার কারিগরদের দক্ষতা
অনেক বেশি। তাদের তৈরীকৃত ধান মাড়াইয়ের মেশিন সহজে ব্যবহার উপযোগী ও
অধিক টেকসই। সারাদেশের পাইকাররা মৌসুম আসলেই তাদের সঙ্গে
যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের চাহিদা মত মালের অর্ডার দিয়ে গাড়ি ভরে নিয়ে
যান। তিনি বলেন, তার কারখানায় সারাবছর কমপক্ষে ৫০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ
করেন। তবে মৌসুম আসলেই তার ৩ গুনেরও অধিক শ্রমিক কাজে লাগাতে হয়।
তারপরও চাহিদা অনুযায়ী মাল ডেলিভারী দিতে পারেন না। প্রায় ২২ বছর ধরে
কারখানা চালাচ্ছেন। যতদিন যাচ্ছে ক্রমেই এখানকার ধান মাড়াইয়ের মেশিনের
সারাদেশে চাহিদা বাড়ছে।
একতা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সত্ত্বাধিকারী সনজিৎ বিশ^াস জানান, পা দিয়ে
চালানো ধানঝাড়া মেশিন এখন মটরচালিত।
ফলে অপেক্ষাকৃত টেকসই করেই এ মেশিন তৈরী করতে হয়। আর অত্যন্ত নিখুতভাবে
মেশিনের বিয়ারিং সেটের কাজ করা লাগে। যেগুলোর জন্য এখানকার কারিগরেরা
বিশেষ পারদর্শী। ফলে এখানকার ধান মাড়াই মেশিন বেশি টেকসই, মজবুত ও
সহজচালিত হয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা মাহাবুব আলম রনি জানান, কৃষিতে এখন
আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। সরকারীভাবে যেমন ফসল রোপন,
কর্তন ও মাড়াই মেশিন কৃষকদের ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তেমনি
কালীগঞ্জের অনেকগুলো ওয়ার্কসপ ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ কারিগর দিয়ে অত্যন্ত
চাহিদা সম্পন্ন করে ধান মাড়াইয়ের মেশিন তৈরী করে বিভিন্ন জেলায় সাপ্লাই
দিচ্ছে। তিনি বলেন, এগুলো কৃষি যান্ত্রিকীকরণের একটি বিরাট উদাহরন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here