খাঁটি গুড়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে গাছিবাড়ি

0
40

খাজুরা (যশোর) প্রতিনিধি : যশোরের যশ, খেজুর রস। খেজুর গুড় শিল্পের ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। ২০১৮ সালে খেজুর গুড় জেলার
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। তবে সময়ের পরিক্রমায় ভেজাল, নায্যমূল্য,
গাছ ও গাছির সংকটে ঐতিহ্য হারানোর উপক্রম। অধিকাংশ গাছির বয়স ষাট বছরের বেশি
হওয়ায় এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে পেশাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন
বাস্তবতায় সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি লক্ষ্যে কাজ করছে সেরকারি
উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বেডস) ও জাপান
এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন ফোরাম (জীফ)।
প্রকল্পের আওতায় যশোরের ইছালী ইউনিয়নের ডাঙ্গাবয়রা এলাকায় গুড় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে
‘গাছিবাড়ি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খেজুর গুড় উৎপাদন,
মোড়কজাতকরণ ও বিপনন করা হচ্ছে।
সমবায়ভিত্তিক এ উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন সদর ও বাঘারপাড়া উপজেলার ৫০ জন প্রান্তিক গুড় তৈরির
কারিগর (গাছি) সদস্য ও তার পরিবার। প্রকল্পের আওতায় সদস্যদের স্বাস্থ্যসম্মত রস সংগ্রহ,
উন্নত গুড় উৎপাদন, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, মোড়জাতকরণ ও বিপণন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদি
সহায়তা প্রদান করা হয়।
বুধবার গাছিবাড়ি ঘুরে দেখা গেছে, খাজুরা বাজার বাসস্ট্যাণ্ড থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে
কিসমত রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর ১০০ মিটার আগে রাস্তার বামে ১০৫ শতক
জমির ওপর গাছিবাড়ি। প্রাচীরের ভেতরে লাল ইটের নান্দনিক ডুপ্লেক্স ভবন ও পাশাপাশি রঙিন
টিনের ছাওনির কয়েকটি ঘর। এর মধ্যে রয়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারী সমবায়
সমিতি অফিস, ট্রেনিং সেন্টার, গুড় প্রদর্শনী কক্ষ, দর্শনার্থীদের থাকার জন্য পাঁচটি কটেজ
এবং রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির চুল্লিঘর। ভবনের সামনে পতিত জমিতে রয়েছে নার্সারি। যেখানে
খেজুরের বীজ থেকে চারা তৈরি করা হচ্ছে।
কথা হয় ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল হালিমের সাথে। তিনি
বলেন, ‘আগে অনেক কষ্ট করেও গুড়ের সঠিক দাম পেতাম না। প্রতি কেজি গুড় ২০০-৩০০ টাকায়
বিক্রি করতাম। রস সংগ্রহ থেকে গুড় বানানো সবই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তখন মনে হতো, এই
পেশায় আর থাকবো না। কিন্তু প্রকল্পের সহায়তায় নানামুখী প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনায়
স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খেজুর গাছ ও ঠিলের (মাটির ভাড়) মুখে নেট বেঁধে রস সংগ্রহ শুরু
করেছি। যার প্রতি লিটার রস ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করছি।’
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাড়ির উঠানে পারিবারিক প্রথায়
স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই আমরা গুড় বানাতাম। এখন গাছিবাড়িতে পরিষ্কার পরিছন্ন ও
স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে কাজ করতে পারছি। সমবায়ভিত্তিক ‘গাছিগুড়’ নামে গুড়ের ব্রাণ্ড তৈরির
মাধ্যমে প্রতি কেজি গুড় ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রির সুযোগ পাচ্ছি।’
সদস্য আবুল খায়ের মণ্ডল বলেন, ‘এখন আর মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়না। আমরা
নিজেরাই সমবায়ের মাধ্যমে নিজেদের গুড় বিক্রি করছি। আয় বাড়ায় সংসারে স্বচ্ছলতা
এসেছে।’
মিরাজ হোসেন নামে এক তরুণ গুড় তৈরির কারিগর বলেন, ‘গুড় শিল্পে তেমন লাভ নেই। এখন দেখছি
ভালো আয় হয়। গতবছর শুরুর মৌসুমে গাছিবাড়ি থেকে ১ হাজার ৭০ কেজি খাঁটি গুড়
বাজারে বিক্রি হয়। এ বছরে তা কয়েকগুন বাড়বে।’
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আসাদুল হাসান জুয়েল জানান, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ও সমবায়ভিত্তিক গুড়
উৎপাদনের ফলে বাস্তবায়িত জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের সহায়তায় সমবায় সমিতির গাছিদের
একত্রিকরণে ‘গাছিগুড়’ নামে ব্রাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে দেশের বিভিন্ন
স্থানে বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ সহ নানামুখী পদক্ষেপের
মাধ্যমে গাছি সদস্যরা তাদের তৈরিকৃত গাছিগুড় বিক্রয় করে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনমানে
ব্যাপক পরিবর্তন সংঘটিত করছে। একসময় বিলুপ্তির পথে থাকা যশোরের খেজুর গুড় শিল্প আবার
নবজাগরণের দ্বারপ্রান্তে। ঐতিহ্য রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার এক
অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছে এই প্রকল্প। এটি আরও সম্প্রসারিত হলে খেজুর রস ও গুড় শিল্প শুধু
যশোর নয়; দেশের অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here