যশোরে অপরাধের আরেক নাম ছিনতাই: বেড়েই চলেছে আতঙ্ক

0
31

ডি এইচ দিলসান : যশোরে ছিনতাই যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন
কোনো ঘটনা নয় বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু
করে পাড়া-মহল্লা, এমনকি গ্রামাঞ্চলের রাস্তাও নিরাপদ নয় বলে অভিযোগ
করছেন সাধারণ মানুষ। দিনে-দুপুরে মোবাইল ফোন, টাকা কিংবা
মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি রাত
নামলেই আতঙ্ক আরও বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যশোর জেলায় ছিনতাই ও
সড়কজুড়ে অপরাধের ঘটনা বেশিরভাগই চাঞ্চল্যকর ও প্রায়ই খবরের
শিরোনাম হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ও পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণে
দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের চলাচল এবং দিনের কাজকর্মে নিরাপত্তার
অভাবের কারণ হিসেবে ছিনতাইয়ের ঘটনা মানুষের মাঝে উদ্বেগ
বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানিয়েছেন, “সকালে
বা রাতে রাস্তয় বের হলে অনেকেই অস্বস্তি অনুভব করেন এবং বিশেষ
নিরাপত্তা বোধ করছেন না।” তারা প্রস্তাব দিচ্ছেন আরও কঠোর পুলিশি
টহল তৎপরতা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং কমিউনিটি
পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
শহরের দড়াটানা, খড়কি, আরবপুর, রেলগেট, বেজপাড়া ও উপকণ্ঠের কয়েকটি
এলাকায় সম্প্রতি ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনার কথা জানিয়েছেন
ভুক্তভোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে পথচারীদের জিম্মি করা
হচ্ছে, কোথাও আবার মোটরসাইকেলে এসে আচমকা মোবাইল
ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ‘বের হলেই ভয় কাজ করে’
খড়কি এলাকার এক কলেজশিক্ষার্থী আজাদুর রহমান বলেন,“সন্ধ্যার পর
একা বের হতে ভয় লাগে। ফোন হাতে কথা বললেই মনে হয় কেউ পেছন
থেকে ছিনিয়ে নেবে।”
এক ব্যবসায়ী রোকনুজ্জামান জানান,“ব্যাংক বা বিকাশ থেকে টাকা
তুলে ফেরার সময় সব থেকে বেশি দুশ্চিন্তা হয়। আগে এমনটা ছিল
না।”
এক সপ্তাহ আগে যশোর শহরের দড়াটানা এলাকায় এক যুবককে লক্ষ্য করে
ছিনতাইয়ের অভিযোগে একটি নারীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে
কোতোয়ালি থানায় ৎিরঃঃবহ অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ
অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, একটি মোবাইল ফোন
ও একটি সোনার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়—এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্টরা
নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে মনিরামপুরে একটি বড় ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগদ
একাউন্ট্যান্টের কাছ থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার
অভিযোগ ওঠে, যা পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৎপরতার মাধ্যমে ৩২ লাখ টাকা
উদ্ধার এবং সাতজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনা
এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, এবং ছিনতাইকারীদের গতিপথ ও
পদ্ধতি বোঝার ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্ব আরোপ করে।
যশোরে গত ১৮ই নভেম্বর দিন-দুপুরে এক প্রবাসীর কাছ থেকে
ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সে দিন সোমবার দুপুরে শহরের বিমানবন্দর
সড়কের ইংলিশ স্কুলের সামনে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ছিনতাইকারীরা এক হাজার মালয়েশিয়া রিংগিত ও ১৫ হাজার বাংলাদেশি
টাকা নিয়ে নেয়। এ ঘটনায় যশোর কোতয়ালি থানায় একটি
অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
৩শরা নভেম্বও চিহ্নিত তিন উড়ন্ত ছিনতাইকারীকে আটক করে যশোরের
কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এ সময় ছিনতাই হওয়া একটি মোবাইল
ফোন ও ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত অ্যাপাচি ফোর-ভি মোটরসাইকেল উদ্ধার
করা হয়েছে।
এর আগে ১১ই অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে শহরের জেলা ও দায়রা আদালত মোড়ে
উড়ন্ত ছিনতাইকারীর কবলে রিকশা থেকে কোলের শিশু সন্তনসহ রাস্থর ওপর
ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন এক নারী। সে সময় আহতরা হন- মাগুরার
শালিখা উপজেলার আঠারখাদা গ্রাামের উত্ম বিশ্বাসের স্ত্রী দীপালী
বিশ্বাস (৩০) ও তার ছেলে রিকো বিশ্বাস (৪)। আহতদের যশোর জেনারেল
হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
গত ২২শে অক্টোবার শহরের ধর্মতলা মোড়ে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে এক
ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা ছিনতাই করে পালানোর সময় এক
যুবককে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা।
৩০ শে অক্টোবর যশোরের বসুন্দিয়ায় ইলেকট্রনিক্স ও পোল্ট্রি ব্যবসায়ীর
নিকট চাঁদা চেয়ে না পাওয়ায় দুষ্কৃতিকারীদের পরিকল্পিত হামলায়
নগদ ৫ লাখ টাকা ছিনতাই, মারধর সহ আরও ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবীর
ঘটনায় যশোর আদালতে মামলা হয়।
১৮ই জুলাই যশোর শহরের ষষ্টিতলাপাড়া এলাকায় ছিনতাই ও ছুরিকাঘাতে
মাহবুবুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন। তিনি
রেলবাজারস্থ ্#৩৯;আশা ইন্টাপ্রাইজ্#৩৯;-এ চাকরি করতেন। ঘটনাটি ঘটে গত
১০ জুলাই রাত বারোটার দিকে।
৩০শে সেপ্টেম্বর যশোরে পুলিশ পরিচয়ে ১৯ ভরি সোনা লুটের
অভিযোগে পুলিশের এক জন কনস্টেবলসহ ৪ জনকে আটক করে গোয়েন্দা
(ডিবি) পুলিশ। এ ঘটনায় আরও এক জন পুলিশ সদস্য জড়িত বলে
জানতে পেরেছে পুলিশ।
যশোর পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, তারা ছিনতাই ও কার্যক্রমে জড়িত গ্যাং
সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের
সহযোগিতা চাইছে যেন তারা সন্দেহজনক কর্মকান্ড দ্রুত জানাতে
পারেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের ধরতে নিয়মিত
অভিযান চালানো হচ্ছে। কয়েকটি ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও
ছিনতাইকৃত মালামাল উদ্ধারের কথাও জানায় তারা। তবে সাধারণ মানুষের
অভিযোগ অভিযান থাকলেও ছিনতাইয়ের প্রবণতা কমছে না।
যশোর কোতোয়ালি থানার এক কর্মকর্তা বলেন,“ছিনতাই প্রতিরোধে
টহল জোরদার করা হয়েছে। কিছু সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে—তাদের
শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।” প্রেসক্লাব যশোরের
সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলছেন, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সহজে
টাকা পাওয়ার লোভ এবং নজরদারির ঘাটতি সব মিলিয়েই ছিনতাই
বাড়ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত আলো ও
সিসিটিভি না থাকায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে।
শহরের বিশিষ্ঠ নাগরিক বিএনপির নেতা রবিউল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন,
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশি টহল বাড়াতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও
পাড়া-মহল্লায় সিসিটিভি বসাতে হবে, কমিউনিটি পুলিশিং
জোরদার করতে হবে, ছিনতাইকারীদেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে
তাহলে ছিনতাই কমবে।
শহরের ব্যবসায়ীক নেতা সোহান বলেন, যশোর ঐতিহ্য, শিক্ষা ও ব্যবসার
শহর। কিন্তু ছিনতাইয়ের ভয়ে যদি মানুষ স্বাভাবিক চলাচলই না করতে
পারে, তবে তা সমাজের জন্য অশনিসংকেত। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না
নিলে এই অপরাধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পাওে, এমন আশঙ্কাই করছেন
সচেতন নাগরিকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here