অভয়নগরে হারিয়ে যাচ্ছে গরু দিয়ে হালচাষ

0
7

রাজয় রাব্বি, অভয়নগর (যশোর) : একসময় কাকডাকা ভোরে গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দে মুখর হয়ে উঠত অভয়নগরের
গ্রামবাংলা। কাঁধে লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠে ছুটে যেতেন কৃষকেরা। বাঁয়ে-
ডানে ‘হুট-হাট’ শব্দে জমিতে হালচাষ চলত সারাদিন। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন
স্মৃতির পাতায় বন্দী। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কৃষিতে এসেছে ব্যাপক
পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের দাপটে গরু ও লাঙল দিয়ে হালচাষ আজ
বিলুপ্তপ্রায়।
সারা দেশের মতো যশোরের অভয়নগর উপজেলাতেও একসময় কৃষিকাজের প্রধান ভরসা
ছিল হাল, লাঙল ও মই। গরু, মহিষ ও জোয়ালনির্ভর এই চাষাবাদই কৃষকের জীবিকা ও
গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। কালের আবর্তে যান্ত্রিক
কৃষির প্রসারে সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও কোথাও
কোথাও টিকে আছে অতীতের সেই চিহ্ন।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে উপজেলার ধোপাধী গ্রামের একটি ধানের জমিতে
গরু ও লাঙল দিয়ে চাষ করতে দেখা যায় এক কৃষককে। আধুনিক যন্ত্রের ভিড়েও এই
দৃশ্য যেন হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার এক টুকরো ইতিহাস।
ধোপাধী গ্রামের ওই কৃষকের নাম আমির আলী। তিনি বলেন, একসময় প্রায়
প্রতিটি কৃষক পরিবারেই অন্তত এক জোড়া গরু থাকত। এখন গরু পালনের খরচ
অনেক বেড়ে গেছে। গো-খাদ্য, রোগব্যাধির চিকিৎসা ও লালন-পালনের ব্যয় বহন করা
অনেকের পক্ষেই কঠিন। তাই সহজলভ্য ট্রাক্টরই এখন কৃষকের প্রধান ভরসা। অল্প সময়ে
কাজ শেষ হওয়ায় যান্ত্রিক চাষের দিকেই ঝুঁকছেন অধিকাংশ কৃষক। তবে আমির
আলীর বিশ্বাস, লাঙল দিয়ে ধীরে চাষ করলে মাটির প্রাণশক্তি বজায় থাকে। তিনি
আরও বলেন, ‘হালের গরু শুধু চাষের উপকরণ নয়, এটা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির
অংশ। মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও এতে আলাদা।’
উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের বুঝতলা গ্রামের প্রবীণ কৃষক লিয়াকত হোসেন
আলী বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার আমল থেকেই এই লাঙল দিয়ে চাষ করে আসছি। জৈব
কৃষি, টেকসই উন্নয়ন আর পরিবেশ সুরক্ষার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন এই
প্রাচীন পদ্ধতির গুরুত্ব নতুন করে ভাবা দরকার। ট্রাক্টর ভালো, কিন্তু মাটিকে সে
চেনে না। গরু মাটির ভাষা বোঝে। তবে নতুন প্রজন্মের কৃষকদের ভাবনায় ভিন্ন
বাস্তবতা।’
উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামের তরুণ কৃষক আল আমিন শেখ
বলেন, ‘আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ। সময়ের
সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে যন্ত্র ছাড়া উপায় নেই। শ্রমিক সংকট আর সময়ের
অভাবে গরু দিয়ে হালচাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন। কৃষি নীতিতে যন্ত্রায়নকে
গুরুত্ব দেওয়া হলেও ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতি সংরক্ষণের উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম।’
এ ব্যাপারে অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ লাভলী খাতুন বলেন,
‘যান্ত্রিক জীবনে এখন কেউ আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। তাই বলদ দিয়ে
চাষাবাদ উপকারী হলেও সময় বাঁচাতে ও সহজ পদ্ধতিতে কাজ করতে কৃষকেরা
আধুনিক যন্ত্রের দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এ কারণে সরকার বিশেষ
সুবিধায় কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করছে। যে কারণে কৃষকরা যন্ত্র দিয়ে হালচাষ করতে
আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু কিছু এলাকায় এখনো বলদ
দিয়ে হালচাষ দেখা যায়।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here