মালেক্জ্জুমান কাকা, যশোর : ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আজ। দুই উৎসবের এই দিনটি স্মরণীয় করতে, প্রিয়জনকে ভালো লাগা ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি জানাতে সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে ফুল। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি আগের দুই দিন এবং রবিবার দুপুরের আগেই গদখালী কেন্দ্রিক ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।
সভ্য সমাজের শুরু থেকেই মানুষ ভালোবাসার বহি:প্রকাশে ফুল ব্যবহার করে আসছে। ডিজিটাল যুগ এলেও ফুলের কদর এতটুকু কমেনি। তার প্রমাণ মিলেছে দেশের সর্ববৃহৎ ফুল উৎপাদনকারী জোন বা ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারা ফুল বাজারে। মহামারি করোনাভাইরাস ও আম্ফান ঝড়ের ত কাটিয়ে প্রায় এক বছর পর বেচা-কেনা বাড়ায় ফুলচাষিদের মুখে অনাবিল হাসি ফুটেছে। বসন্ত বরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলে গত তিনদিনে গদখালী ফুল বাজারে ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় পূর্বের বাজার দর থেকে এদিন বেশি দামে ফুল বিক্রি হয়েছে। গদখালী ফুল বাজারে বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস উপলে গত তিনদিনে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে চায়না গোলাপ। বাজারে এ গোলাপ বিক্রি হয়েছে ১৮-২০ টাকা, যা পূর্বে ছিল ছয় থেকে আট টাকার মধ্যে। রজনীগন্ধার প্রতি স্টিক বিক্রি হয়েছে সাড়ে আট থেকে নয় টাকা, যা পূর্বে ছিল পাঁচ টাকার মধ্যে। গ্লাডিওলাস রঙ্গীন ফুলটি বিক্রি হয়েছে ১৪ থেকে ১৬ টাকায়, যা পূর্বে ছিল ছয় টাকা। জারবেরা বিক্রি হয়েছে ১০-১২ টাকা, পূর্বে তার দাম ছিল আট টাকার মধ্যে। গাঁদা ফুল বিক্রি হয়েছে ৩০০-৪০০ টাকা প্রতি হাজার। এর পূর্বের দাম ছিল দেড় থেকে ২০০ টাকা প্রতি হাজার। ফুল বাঁধাইয়ের জন্য কামিনীর পাতা বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা আটি। পূর্বে তা ২৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। জিপসির আটি বিক্রি হয়েছে ৪৫-৫০ টাকা। যা পূর্বের দাম ছিল ২০-২৫ টাকা। ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউপির কুলিয়া গ্রামের ফুলচাষি শাহ আলম বলেন, তিনি দেড় বিঘা জমিতে চায়না গোলাপ ও গাঁদা, এক বিঘা জমিতে জারবেরা ও ছয় বিঘা জমিতে গ্লাডিওলাস ফুলের চাষ করেছেন। গত তিনদিনে সোয়া তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন তিনি। পানিসারার মাহাবুর বলেন, রোববার সকালে হঠাৎ করেই বেশি দরে তিনি গোলাপ, ঝাউ ও গাঁদা ফুল বিক্রি করেছেন। নীলকণ্ঠনগরের হোসেন আলী বলেন, তিনি আড়াই বিঘা জমিতে গোলাপ ও এক বিঘা জমিতে গ্লাডিউলাস ফুলের চাষ করেছেন। গত তিদিনে তিনি এক লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। হাড়িয়া গ্রামের ইব্রাহীম হোসেন দেড় বিঘা জমির ৫০ হাজার টাকার গোলাপ ফুল বিক্রি করেছেন। তাদের দাবি মহামারি করোনাভাইরাস ও আম্ফান ঝড়ের তি কাটিয়ে প্রায় এক বছর পর ফুলের দাম ও চাহিদা কিছুটা বেড়েছে বসন্ত বরণ আর ভালোবাসা দিবস উপল্েয। ফুল ব্যবসায়ী নুর হোসেন শুক্রবার দুই লাখ টাকার ও ব্যবসায়ী আকবর আলী এক লাখ টাকার ফুল কিনেছেন। বাংলাদেশ ফাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, ঝিকরগাছার গদখালী এলাকায় ১৬০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পাঁচটি ও পরীামূলকভাবে আরও ৬/৭ টি জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। মহামারি করোনাভাইরাস ও আম্ফান ঝড়ে তির পরে এ দুই দিবস ঘিরে ফুলের চাহিদা বাড়ায় প্রায় এক বছর পর ফুলচাষিদের কিছুটা পুষিয়েছে।
রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জারবেরাসহ প্রায় ১১ প্রজাতির ফুল চাষ হয় ফুলের রাজ্য গদখালীতে। যশোর জেলায় প্রতিবছর প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। ফুলের বাজার ধরতে দিনরাত পরিশ্রম করেন এখানকার ফুলচাষিরা। যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলার আটটি উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়ে থাকে। ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারা গ্রামেই প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ফুল চাষ করছেন ছয় হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদিত ফুল দিয়ে দেশের মোট চাহিদার ৭০ ভাগ যোগান দেন এখানকার চাষিরা। যদিও ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও করোনা মহামারির কারণে ফুলের উৎপাদন কমে গেছে। করোনার মধ্যেই চলতি বছরের বিভিন্ন দিবসকে টার্গেট করে গত বছরের আগস্ট মাস থেকে নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন এই অঞ্চলের ফুলচাষিরা। ফুল খেতের পরিচর্যায় দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছেন তারা। গত কয়েক মাস হাড়ভাঙা খাটুনির পর তাদের খেতে নানা রঙের ফুল ফুটতে শুরু করেছে। এ বছর ২৭২ হেক্টর জমিতে গ্লাডিওলাস, ১০৫ হেক্টর জমিতে গোলাপ, ১৬৫ হেক্টর জমিতে রজনীগন্ধা, ২২ হেক্টর জমিতে জারবেরা, ৫৫ হেক্টর জমিতে গাঁদা এবং ছয় হেক্টর জমিতে অন্যান্য ফুলের চাষ হয়েছে। গদখালী অঞ্চলে পাঁচ হাজার চাষির মধ্যে সরকারের প্রণোদনা ঋণ পেয়েছেন মাত্র ৫৫ জন। বাকিরা বিভিন্ন এনজিও ঋণ ও জমি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারের প্রনোদনা সম্পর্কে সাধারন ফুল চাষীদের মন্তব্য যাদের আছে তারাই এবার প্রনোদনা পেয়েছে। নইলে তারা কখনোই বিবেচনায় আসেনা।















