ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বর পাচারকারী/ সাতক্ষীরার বৈকারী সীমান্ত আন্তর্জাতিক নারী পাচারের নিরাপদ রুট

0
317

সাতক্ষীরা ব্যুরো প্রধান: সাতক্ষীরা বৈকারী সীমান্ত আন্তর্জাতিক নারী পাচারের নিরাপদ রুট হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে ৪০ বছর ধরে। নারী পাচারের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যুবতী মেয়েদের ভারতে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিতে পাচার করা হত। পাচারকারী স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বর ও প্রভাবশালী বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা ভাগ পেত। সম্প্রতি ভারতের নারী পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রের তথ্য এসেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এই চক্রে রয়েছে যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও নড়াইল জেলার বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বররা। এসব জেলা দিয়ে পাচার করা নারীদের ভারতের কলকাতা, কেরালা, বেঙ্গলুর ও চেন্নায় পতিতালয় বিক্রি করত। সম্প্রতি ভারতের এক তরুণীকে নির্যাতন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নারী পাচারের ঘটনায় ৫টি মামলা হয়েছে। প্রথম ৩টি মামলায় বাংলাদেশের ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নারী পাচারে জড়িত থাকায় অর্ধশত সদস্য নজরদারীতে রয়েছে। অর্ধ ডজনকে যে কোন সময় গ্রেফতার করা যেতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে। বৈকারী থেকে গ্রেফতার হয়েছে ধাবকপাড়ার মৃত গফুর ধাবকের পুত্র কাদের ধাবক, তারপুত্র মেহেদী হাসান বাবু। কালিয়ানী সীমান্ত থেকে পল্টু কারিগরের ছেলে সালাম কারিঘর (স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের পালিত ছেলে)। কাথণ্ডা গ্রামের আব্দুল মুজিদের ছেলে মহিউদ্দীন (ওপফে বুনো) ছেলে আমিরুল। বাঁশদহা গ্রামের ইসহাক আলীর ছেলে আকবর আলী। গ্রেফতার হওয়া ১৩জন ব্যক্তির মধ্যে ৮জন আদালতে ১৬৪ ধারার শিকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। জবানবন্দীতে আসামীরা উল্লেখ করেছেন ভারতে অবস্থানরত সবুজ এই চক্রের হোতা।
পহেলা জুন ঢাকা হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা হয়। সেই মামলায় গ্রেফতার কাথণ্ডা গ্রামের আমিরুল ইসলামের জবানবন্দীতে আকবরের নাম উঠে আসে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানের পালিত ছেলে আব্দুস সালাম মেয়েদের ভারতে পাচার করে দিত। আমিরুলের জবানবন্দীতে আরো উল্লেখিত করেছেন মেয়েদের এনে বৈকারীর সুজদ্দীর ছেলে আনিসুর রহমানের কাছে পৌছে দিত। পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে বলছে নারী পাচারের মূল হোতা সহ পুরো চক্রটিকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব। এ ব্যাপারে দফায় দফায় অভিয়ান পরিচালত হবে। গ্রেফতার হওয়া বৈকারী ধাবকপাড়ার মেহেদী হাসান বাবু তার শিকারোক্তি মূলক জবানবন্দীতে বলেছেন স্থানীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে তার ছেলে ইনজামমুল ইনজা পালিত ছেলে আব্দুস সালাম, মেম্বর ইসারুল ইসলাম, তার চাচা হারুণ এই কাজ দেখাশুনা করত। জনাববন্দীতে আরো উল্লেখ করেছেন আনিসুর রহমানের নির্দেশে আব্দুস সালাম কাথন্ডার মহিউদ্দীন, বৈকারীর মুনছুরের ছেলে শাহিন, মজিবর রহমান নজুর ছেলে আমিরুল ও মনিরুল, শহিদ অবৈধভাবে নারী পাচার করত।
বৈকারী ইউনিয়নের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানায় নারী পাচারের সাথে জড়িত আরো অনেক জনপ্রতিনিধিরাও এখনও তাদের পাচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায় বৈকারী ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বর শহিদুল ইসলামের ৩ মেয়ে রূপা, বিপাসা, পিপাসা ১০/১২ বছর পূর্বে ভারতের বেঙ্গারুল গিয়ে দেহ ব্যবসা শুরু করেছে এবং বাংলাদেশ থেকে মেয়েদের পাচার করে তাদের কাছে পাঠানো হয়। তারা এই মেয়েদের দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করে। শহিদুল ইসলাম এলাকার একজন প্রভাবশালী মেম্বর হওয়ায় নারী পাচারকারীদের সহযোগিতা করে থাকে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। এ ব্যাপারে শহিদুল মেম্বরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন তার মেয়েরা ভারতে শ্বশুর বাড়িতে থাকে। শ্বশুর বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাৎক্ষনিক কোন উত্তর দিতে পারিনি। একই ইউনিয়নের মৃগীডাঙ্গা গ্রামের মৃত বাবুর আলীর ছেলে ইউনুস (পাচার ইউনুস নামে পরিচিত) তার বোন সুফিয়া খাতুন দীর্ঘদিন ধরে কোলকাতার সোনাগাছী (পতিতালয়) দেহ ব্যবসা করে। সে সোনাগাছীতে একটি মিনি পতিতালয় খুলেছে। বৈকারী সীমান্ত দিয়ে পাচারকৃত নারীদের অনেককে সুফিয়ার কাছে চাকরির জন্য পাঠানো হয়। সুফিয়া যখন ভারতে গিয়েছিল একই সাথে ইউনুস ও ভারতে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ইউনুস দেশে এসে নারী পাচারের সাথে জড়িতে পরে। সুফিয়া ও ইউনুসের নামে নারী পাচারের নামে মামলাও হয়েছে। স্থানীয় ইউপি মেম্বর আলী হোসেন এই প্রতিবেদনকে জানান ইউনুস আগে পাচার কাজে জড়িত ছিল এখন আছে কি না জানি না। সুফিয়া ও ইউনুসের ভারতের আমোদিয়ায় ৩ তলা একটি বাড়ি আছে। এছাড়া দমদম এয়ারপোর্টের পার্শ্বে বীরআটি এলাকায় ১৫ শতক জমি, বশিরহাট পেয়ারাতলায় ১০ শতক জমি ক্রয় করা আছে। এব্যাপারে ইউনুসের সাথে কথা বললে তিনি জানায় আমার বোন ভারতে শ্বশুর বাড়িতে থাকে। আমি এখানে মৎস্য ঘেড়ের ব্যবসা করি। পাচারের সাথে আমি জড়িত নয়। একই গ্রামের মোজাম্মেলের ছেলে জাহাঙ্গীর ও ওয়াজেদের ছেলে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বলে এলাকাবাসী জানায়। বৈকারী সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ইয়াবা, গাজা, ফেন্সিডিল পাচার করে নিয়ে বৈকারী কাথণ্ডাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে থাকে বলে এলাকাবাসী জানায়। এছাড়া বৈকারী নারী পাচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, মাদকের বড় বড় চালান এই পাচারচক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাত বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। একই ইউনিয়নের কাথন্ডা গ্রামের প্রাক্তন মেম্বর কেরাশতুল্লা মোড়লের ছেলে ইব্রাহিম মোড়ল মানবপাচারের সাথে জড়িত বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। তার কাছে কেশবপুরের আশরাফুল, কলারোয়ার রোকসানা, শহিদ হোসেন, মানিক হোসেন, ময়না ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছে ভারতের বোম্বে শহরে তাদের ভালো চাকরি দেবে বলে। দীর্ঘ ৫ বছর হলেও তাদের ভারতে পাঠাচ্ছে না টাকাও ফেরৎ দিচ্ছে না বলে অভিযোগে জানা যায়। এ ব্যাপারে ইব্রাহিম মোড়লের ০১৭৭২-৯৫৯২৫৩ নম্বরের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা কররে মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। বৈকারী ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কওসার আলী বলেন প্রকৃত দোসীরা শাস্তি পাবে, তাই সে যতবড় ক্ষমতাশালী হোক না কেন। নারী পাচারের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here