মালিক্জ্জুামান কাকা, যশোর : কিশোর গ্যাং প্রতি মহল্লায় ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। যশোর শহরের মহল্লায় মহল্লায় এরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে অমুক ভাইয়ের লোক অমুক ভাইয়ের শিষ্য এভাবে দাপিয়ে একের পর এক অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। মানছেনা এরা কোন অভিভাবক নিষেধ বা সভ্যজনের কমান্ড। গ্যাং পরিচালকের কথায় এরা খুন, সন্ত্রাস, মাস্তানী, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হুমকী ধামধীর অপতৎপরতায় সদা লিপ্ত। পুলিশ প্রশাসন জানায়, কিশোর গ্যাং যশোরের একটি পুরাতন সমস্যা। এর আগে পোক বাহিনী ছিল। তার পর শহরের রেলস্টেশনের ম্যানসেল বাহিনী, ষষ্টীতলার হাঁস সোহেল বাহিনী, মরা-তরিকুল বাহিনী, রায়পাড়া ইসমাইল কলোনীর কুদরত বাহিনী, শঙ্করপুর ষাড় অফিস পাড়ার ভাইপো রাকিব বাহিনী, খড়কীর বর্ষন বাহিনী, রেলগেট পশ্চিমপাড়ার সাইদুল বাহিনী, কলাবাগান পাড়ার সাগর রমজান বাহিনী, কারবালার হাফিজ ভূট্টো বাহিনী, আরিফপুরের দাতাল বাবু বাহিনী, চাঁচড়া চেকপোষ্টের রাহুল বাহিনী, বেজপাড়ার সোহাগ বাহিনী গুলো তার ধারাবাহিকতার প্রমান। এসব বাহিনী সদা জাগ্রত। এক সময় এসব বাহিনী বিএনপির নেতারা পরিচালনা করতো। এখন তার পরিচালক আওয়ামীলীগের নেতারা। আরো মজার বিষয় এই, ২/১ জন বাহিনী প্রধান খুন বা বিদেশ চলে গেলেও বাদ বাকি বাহিনী গুলো গত ১৫/২০ বছর সেই কিশোরেই বহাল আছে। নিত্য নতুন সদস্য সংগ্রহ করে এরা তার কিশোরত্ব বজায়ে রেখেছে।
সূত্র জানায় বাহিনী প্রধান হাঁস সোহেল খুন হয়েছে। একটি মামলার রায়ে কারাদন্ড নিয়ে মরার ভাই তরিকুল কারাগারে। মরা ক্রস ফায়ারে মারা পড়েছে। সাইদুল বর্তমানে ইটালি রয়েছে। রাহুল অস্ত্র মামলায় কারাগারে অন্তরীন। বাদ বাকি কিশোর গ্যাং গুলো বহাল রয়েছে যশোরে। যশোর সদর এমপি ও কেশবপুর-৬ আসনের এমপির পকেটের লোক হিসেবে এসব বাহিনী পরিচালকরা চিহ্নিত। কিশোর গ্যাং পরিচালকরা ইতিমধ্যে কিশোর থেকে যুবক, যুবক থেকে ব্যক্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে তবু তাদের বাহিনী এখনো কিশোর গ্যাং। কেননা বাহিনীতে ১০ বছর বয়সী থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরের ছড়াছড়ি। গত ১৩ বছর ধরে এই বাহিনীতে কিশোরের ফি বছর গড় ৪২ থেকে ৭৭ পার্সেন্ট। নাম না প্রকাশের শর্তে একজন কিশোর গ্যাং পরিচালক জানায়, কিশোররা প্রশ্ন ছাড়ায় নেতার কথা অনুয়ায়ি কাজ করে। ওরা দেখে না কাজটি সঠিক না বেঠিক। তাছাড়া অস্ত্র বা বোমা ওরা সহজে ব্যবহার করতে পারে চিন্তা ভাবনা ছাড়াই। চাকু কাছে থাকলে ওরা নিজেকে মনে করে কিং বানসাল। পিস্তল দিলে অভিভাবকদেরও কেয়ার করেনা। তখন শুধু নিজের নেতার কমান্ড ফলো করে। মিছিল মিটিং ছাড়া ওরা আমার সাথে থাকে। কারো তো কোন ক্ষয় ক্ষতি করেনা। তাহলে অমুক কে মারলো কে? এ প্রশ্ন করতেই জানায় ‘আমাকে মারার জন্য বোমা বানিয়ে সুযোগ খুজছিল। দিছি একেবারে। জীবনের উপরে উঠে গেলে সেটি ভিন্ন কথা।’ একজন কিশোর গ্যাং সদস্যের অভিভাবক বলেন, আমার পুত্র আমার কথা শোনেনা। সে থাকে অমুকের কাছে। তার কথায় ওঠে বসে। মামলা হয়েছে ছয়টি এখন ওর জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছি। ইয়াবা বাবা নাকি যেন কি খায় শুনি। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ঘুমায়। ঘুম থেকে উঠে বাপ কেলানো ভাইয়ের কাছে চলে যায় আসে গভীর রাতে বা পরদিন ভোরে। বাড়ির পিচ্চিটা (নাতি) বলে মামার কাছে পিস্তল আছে! আমাকে অনেকেই অনেক কথা বলে কিন্ত বহু মারধোর করেও পথে আনতে পারিনি। এখন মারধোর করা ছেড়ে দিয়েছি। মারা গেলে মাটি দিয়ে বাড়ি ফিরবো কান্না কাটি করবোনা। ভাববো কপালের লিখন। ভালো করার তাবিজ এনে দিয়েছি পরেনি। তাবিজ খুলে কোথায় ফেলে দিয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের একজন বর্ষীয়ান নেতা বলেন অমুক বাহিনী অমুক বাহিনীতে যশোর শহর ভরপুর। ফলে ত্যাগী পরিক্ষীত নেতা-কর্মীর আর প্রয়োজন নেই যেন। বাহিনীর পরিচালক ও তাদের হোমরা চোমরারাই এখন দলের কাছে বেশি গ্রহনযোগ্য। শুনি এরা ঈদ পার্বণে এরা লাখ লাখ টাকা বোনাস পায়। আমার ব্রেনেও আসেনা কিভাবে এসব সম্ভব। সূত্র জানায়, কিশোর গ্যাং এতটাই ভয়ানক যে, ওরা যখন তখন খুন খারাবি করে। চাঁদাবাজি, মারামারি, হুমকি ধামকি, চাকু মারা বা স্টেপিং এ ব্যস্ত থাকে ওরা। ভালো কাজ নেই, একটাও অপরাধের গোসাই। এসব কিশোর সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছে যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউপির চেয়ারম্যান আলমগীর হোাসেন। সন্ত্রাসী হাঁস সোহেল, ছাত্রলীগ নেতা ইমন, চাঁচড়া রাজবাড়ি কবরস্থানে জোড়া খুন, রানার সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুকুল খুনে এসব কিশোররাই জড়িত। চলতি বছরে ঘোপে ২/৩ টি হত্যার ঘটনায় শোনা যায় এসব কিশোর বাহিনী জড়িত। উপশহর পার্ক এলাকায় একটি আলোচিত দরিদ্র খুনেও এরা জড়িত। পালবাড়ী ঈজিবাইক সিন্ডিকেট হোতা খুনেও একই কিশোর বাহিনী জড়িত। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও ভূক্তভোগী পরিবারের উদ্ধৃতি অনুসারে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া জেলা পিপি এজেড এম ফিরোজের পুত্র অর্নব ও যুবদল নেতা পলাশ হত্যায় শহরের চিহ্নিত কিশোররা জড়িত। যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়ায় মৎস্য ব্যবসায়ি ইমরোজ হত্যা কান্ডটিও কিশোরদের। ইমরোজের পিতা নুরু মহুরী জানান, চাঁচড়ার পান্নুর অর্ডারে চিহ্নিত কিশোর সন্ত্রাসীরাই তার পুত্র কে হত্যা করেছে। চাঁচড়ার একজন মৎস্য ব্যবসায়ি বলেন, কিশোর গ্যাং এর ঠেলায় পথে চলাচল দায় হয়েছে। তুই কি করিস প্রশ্ন করলে বলে কেউ রেলস্টেশনের অমুক ভাইয়ের লোক, কেউ তসবীর মহল এলাকার ভাইয়ের লোক। আবার কেউ কাউন্সিলরদের নামও বলে যে তার লোক। এদের কেউ কেউ উপজেলার একজন জনপ্রতিনিধির কথাও বলে। পেটে নেই শিক্ষা, নাম বানান করে পড়তে পারেনা, সোজা হয়ে দাড়াতে পারেনা, নাকে মুখে পোটা অথচ অমুক ভাইয়ের বড্ড লোক হয়ে বসে আছে। কি আর বলবো। ঘেন্না হয় খুব। শহরের একজন চা মুদী দোকানদার বললেন, অমুক ভাইয়ের ঐসব ছোকরাদের ভয়ে বিড়ি সিগারেট বিক্রি ছেড়ে দিয়েছি। একেক জন যা ইচ্ছে খায় তার পর বেনসন গোল্ডলীফ সিগারেট ধরায় চোখের সামনে দাম চাইলে বলে ভাই দেবে। ভাই আর দেয়না। ছোকরাদের কাছে চাইলে চাকু টাকু বের করে। তাই আমার অত লাভের দরকার নেই। লাভ কম হোক, জীবনটাতো বেঁেচ থাকুক। কি করবো ওরা পিতা মাতার কমান্ডও মানেনা। এখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করে। কিছুই বলার নেই। একটি মানবাধিকার সংগঠনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার কাজী জাকারিয়া বলেন, কিশোর গ্যাং ভয়ঙ্কর আকার ধারন করেছে। সকল বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিৎ এসব কিশোর কে সন্ত্রাসের আধার পথ থেকে সরিয়ে আনতে, মাদক ইয়াবার হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে উদ্যোগী হওয়া। হাতে আর সময় নেই। এখনি এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সকলকে করতে এগিয়ে আসতে হবে।














