পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা/ দশমিনায় খরস্রোতা দেড় শতাধিক খাল এখন অস্থিত্বহীন

0
275

নাসির আহমেদ,দশমিনা (পটুয়াখালী) : পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় খরস্রোতা প্রায় দেড় শতাধিক খাল এখন অস্থিত্বহীন হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এক সময়ের খরস্রোতা খাল থাকলেও এখন সেই স্থানে চাষাবাদযোগ্য জমিতে পরিনত হয়ে গেছে। উপজেলায় বর্ষা হলে জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে পানি শুন্যতা দেখা দেয়। প্রতিকুলতার মধ্যে দশমিনা উপজেলার কৃষকরা জমি চাষাবাদ এবং ফসল উৎপাদন করে আসছেন । সিএস ম্যাপে উপজেলায় দেড় শতাধিক খরস্রোতা খাল থাকলেও পর্চা ম্যাপে খালগুলো কৃষি খাসজমি দেখিয়ে ভুমি অফিসের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভূমি খাদকরা বন্দোবস্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পানি নিস্কাশনের মাধ্যম খালগুলো দিয়ে নদী কিংবা সাগরে থেকে পলিমাটি আসতে না পারায় ফসলি জমির উর্বরা শক্তি হারিয়েছে। এছাড়া তিকর কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া উৎপাদন হচ্ছে না ফসল। ভুক্তভোগী কৃষক ও কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়,এক সময় উপজেলার বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদী থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপত্তি হওয়া প্রায় দেড়শতাধিক খাল দিয়ে ফসলি জমিতে পলিমাটি এসে পড়তো। গ্রাম থেকে গ্রাম ছিল নৌ-যোগাযোগ। দনিাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাউফল উপজেলার কালাইয়া বাজার ও গলাচিপার উলানিয়া বাজারে নৌকা ও ট্রলারে মালামাল পরিবহন করা হতো। কিন্তু সেই খালগুলো মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে এর চিহ্ন নেই। চলে না নৌকা, পড়ে না ফসলি জমিতে পলিমাটি। ফলে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ফসল উৎপাদন করতে প্রয়োগ করতে হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। যা মানব দেহের ব্যাপক তি সাধন করে। স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, বিগত সময়ে ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভূমি খাদকরা নামে বেনামে খাল বন্দোবস্ত নিয়েছে। কেউ ভরাট করে কিংবা বাধঁ দিয়ে মাছ চাষ করছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণ করায় খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা হলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর শুকনো মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। জলাবদ্ধতা ও পানি সংকটে ফসল ব্যাপক তির সম্মূখীন হচ্ছে । সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার প্রান কেন্দ্রে অবস্থিত গালর্স স্কুল সংলগ্ন আবুতারা নামক খালের ওপর ২০১৬সালে নির্মিত ব্রিজটি কালের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই খালটি ১৪/১৫ জনে দখল করে রেখেছে। খালে দুই পাশ কেটে মাটি ভরাট করে চাষযোগ্য জমি তৈরি করেছে। অথচ এ খালটি দিয়ে আগে নৌকা চলাচল করতো। প্রায় দুই হাজার একর জমির পানি উঠানামা করতো। নদী থেকে পলিমাটি পড়ে জমির উর্বর শক্তি বৃদ্ধি করতো। এখন কীটনাশক ও সার ছাড়া কোন ফসল উৎপাদন হয় না। উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের চরহোসনাবাদ গ্রামের খালটি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। এ খাল দিয়ে প্রায় ৫হাজার একর ফসলি জমির পানি উঠানামা করতো। স্থানীয়রা ওই বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য একটি মামলা দায়ের করেছে। লীপুর গ্রামের নিবারন কবিরাজের নামের বিশাল খালটি ১০-১৫ হাত পানি থাকা অবস্থায় বন্দোবস্ত দিয়েছে ভূমি অফিস। বন্দোবস্ত প্রাপ্তরা খালটি ভরাট করে বোরো ধান চাষাবাদ করছে। এই খাল দিয়ে প্রায় ৩হাজার একর জমির পানি উঠানামা করতো। উপজেলা সদরের দনি আরজবেগী আজগুরিয়া খালটি স্থানীয় প্রভাবশালী ধনাঢ্য কাসেম খাঁসহ ১০/১২ জনে বন্দোবস্ত নিয়েছে। ওই খালে শুস্ক মৌসুমে ১০/১২ হাত পানি থাকে। খালটি দখলকারীরা বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করেছে। ফলে পানি উঠানামা করতে পারে না। জলাবদ্ধতায় যথাসময়ে প্রায় ১হাজার একর জমি চাষাবাদ হয় না। উপজেলার দশমিনা সদর ইউনিয়নের পশ্চিম লীপুর খাল, আবুতারা খাল, গাজীপুরা খাল, গয়নাঘাট খাল, পূর্ব লীপুর বাবুর খাল, আলীপুর ইউনিয়নের খলিশাখালী গ্রামের কেয়ার খাল, ইঞ্জি নারায়ন খাল, শিংবাড়িয়া খাল,গুলবুনিয়ার খাল,রণগোপালদী ইউনিয়নের কাটাখাল, আউলিয়াপুর গ্রামের নাপ্তার খাল, তালতলার হোতা খাল স্থানীয় প্রভাবশালীরা বন্দোবস্ত নিয়েছে । এসব খাল প্রভাবশালীরা দখল করে মাটি ভরাট ও বাঁধ দিয়েছে। ফলে প্রতি বছর জলাবদ্ধতা ও পানি শূণ্যতায় নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমির ফসল। বাঁধ ও অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণের ফলে বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদী থেকে পলি মাটি আসতে পারছে না। ফলে ফসলি জমির উর্বর শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের নিস্কাশনের খালগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে, নদীর পানি উপজেলার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় অতিরিক্ত পানির চাপে নদীর তীরে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে । ২০০৮ সালে উপজেলার শত শত কৃষক খালের অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য কর্তৃপ বরাবরে একাধিক আবেদন করেন। ওই বছরের ১৯ নভেম্বর উপজেলা কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ১৬৪টি বন্দোবস্ত কেস বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভূমি খাদকদের করা মামলা আদালতে বিচারধীন। এই বিষয়ে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও ভূমি বন্দোবস্ত কমিটির সদস্য সচিব মোঃ আব্দুল কাউয়ুম জানান,খোঁজ নিয়ে জানাব কতটি মামলা আছে এবং একটি খালের অভিযোগ এসেছে আগামী মিটিং বিষয়টি আলোচনা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here