মোস্তাফিজুর রহমান-কোটচাঁদপুর : “ও ধান-ধান ভানোরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া,
আমি নাঁচি তুমি নাঁচ হেলিয়া-দুলিয়া ও ধান ভানোরে” সকালে গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে কৃষানীদের নবান্নের চিড়া-কুটা, কুমড়ো বড়ি দেয়া আর পিঠা তৈরীর চাউলের গুড়া করার ঢেঁকির ধুপ-ধাপ শব্দ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঢেঁকির স্থান দখলে নিয়েছে মিল করকারখানা।
” গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির বৌ-ঝিদের
এক সঙ্গে ধান ভানার সেই ঐতিহাসিক গীত এখন আর শুনা যায় না। এক সময় সারা দেশের মতই কোটচাঁদপুর উপজেলার গ্রাম-গঞ্জের গৃহস্থ বাড়িতে ধান ভানার জন্য ঢেঁকি ছিল গৃহস্থালী কাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বস্তু। কিন্তু এখন আর সে সকল বাড়িতে ঢেঁকি নেই। গৃহস্থরা কেউ পুরনো ঢেঁকিকে জঞ্জাল মনে করে তা কেটে ফেড়ে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করেছে। আবার কেউ নিদর্শন হিসেবে বৈঠক ঘরের আড়াই ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে প্রায় বিলৃপ্ত হতে চলেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প। এ বছর শীতের শুরুতেই কোটচাঁদপুরের গ্রাম গঞ্জ ঘুরে দেখা যায় গত কয়েক বছরের তুলনায় এবছর ঢেঁকির চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। কারণ হিসাবে অনেকেই বলেছেন ঢেঁকিছাটা চাউলের গুড়োর মত স্বাদ মিলে ভাংগানো গুড়োয় পাওয়া যায়না। এক সময় ভুমিহীন, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা অভাবী অসহায় মহিলাদের আয়- উপার্জনের প্রধান উৎস ছিল ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানা, বড়ি কুটা, চিড়া তৈরির কাজ। বড় গৃহস্থের বাড়িতে যখন নতুন ধান উঠতো তখন সে সকল অভাবী নারীর ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে দিত। এতে যে মজুরি পেতো তা দিয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চলতো তাদের। আবার কেউ ধান কিনে ঢেঁকিতে চাল করে বাজারে বিক্রি করে সেই আয় দিয়ে সংসার চালাতো। এ সময় ঘন্টার পর ঘন্টা একত্রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হাসি’র কিচ্ছা কাহিনী, গ্রামীন গীত, শ্লোক বলতো। এতে তাদের শ্রমের কষ্ট কুমে যেতো আনন্দে এবং বিভিন্ন উপকরণ তৈরির কাজও শেষ হতো। বাড়িতে মেহমান এলে বৌ-ঝিরা পিঠা বানানোর জন্য ঢেঁকিতে চালের গুড়া করে রাতভর পিঠা বানিয়ে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সবাই এক সাথে বসে পিঠা খাওয়ার সেই দৃশ্য এখন আর নেই বললেই চলে। এখন ঢেঁকির ছাটা চাল পাওয়া দুরে থাক পিঠা তৈরির জন্য চালের গুড়া করতে দু’এক গ্রাম খুঁজলে ঢেঁকির সন্ধান মেলেনা। বড় গৃহস্থের বাড়িতে কয়েক বছর আগেও একাধিক ঢেঁকি দেখা যেতো। এখন সেই বাড়িতে ঢেঁকির পরিবর্তে ডিজেল চালিত মেশিনে ধান ভাঙ্গানো ও পিঠা, সেমাই তৈরির চালের গুড়াও করে থাকে। এ মেশিন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট বাজারে বসানো হয়েছে। তাছাড়া এখন ভ্রাম্যমান তিন চাকার ভ্যান গাড়িতে করে শ্যালো মেশিন দিয়ে ধান ভাঙ্গানো কল নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ধান ভাঙ্গানো ও চাল গুড়া করা হচ্ছে। আবার কেউ ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছে। উপজেলার স্বরুপ গ্রামের (৬০) বছর বয়সী বিধবা নারী মর্জিনা বলেন, ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া ধানের চালের ভাত খেতে সুস্বাদু এবং ঢেঁকির চালের গুড়া দিয়ে পিঠা বানালে এর স্বাদ আরো অতুলনীয়। আমাদের সময় ঢেঁকিতে ভানানো চালের ভাত খেতাম। এখনকার বউঝিরা খেতে চাই না। ওরা কলে ভানা চালের ভাত খায়। পৌর এলাকার খন্দকার পাড়ার (৮০) বছর বয়সী বিধবা নারী ভানু বিবি বলেন, এখন আর গৃহস্থ বাড়িতে সকাল- সন্ধ্যায় ঢেঁকির চির-চেনা ধুপ-ধাপ মিষ্টি শব্দ শোনা যায় না। আধুনিকতার ছোঁয়াই কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এখন ধান ভাঙ্গানোর শ্যালো মেশিনের কান-জ্বালাপালা করা শব্দ দুষণ সকল কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সকালে কৃষানীর ঢেঁকির শব্দে যে কৃষকের ঘুম ভাঙ্গতো সেই কৃষক শ্যালো মেশিনের বিকট শব্দে এখন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে। তাই সব মিলিয়ে আজ যান্ত্রিকতার চাপে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকিশিল্প ক্রমান্বয়ে বিলিনের পথে। এখন আর প্রতি পাড়ায় পাড়ায় ঢেঁকি দেখা যায় না।















