তরিকুল ইসলাম : লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষসহ মনের পশুকে পরাভূত করার বাণী নিয়ে আবারও এসেছে কোরবানির ঈদ। আগামীকাল রাত পোহালেই আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদের আনন্দে মাতবে সারাদেশ। তবে উৎসবের বাতাবরণে ভয় জাগাচ্ছে সারাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া মরণঘাতি করোনা ভাইরাস।
ঈদুল ফিতরের মতো কোরবানির ঈদের তারিখ নিয়ে আনন্দময় অনিশ্চয়তা থাকে না। আট দিন আগেই পশ্চিম আকাশে জিলহজের চাঁদ জানান দিয়েছে কোরবানির বারতা। আগামীকাল বাংলাদেশের সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করবেন। তবে পশু কোরবানি প্রতীকী। কবি নজরুল বলেছেন, ‘মনের পশুরে করো জবাই- পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’
সবাই সাধ্যমতো সেরা পশু কোরবানি দেবেন ঈদে। তবে এবার উৎসবের আমেজ ম্লান করে দিয়েছে করোনা আতঙ্ক। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে এ রোগে। আর সরকারি হিসাবে এই রোগে এ পর্যন্ত মারা গেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। আর আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ১০ লাখের মতো মানুষ। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২০ লাধিক। করোনা মহামারিতে স্বজনহারা মানুষের ঘরে আসবে না ঈদের আনন্দ। উত্তরাঞ্চলে ইতিমধ্যে অতি বর্ষায় অনেক মানুষের ঈদ মাটি হয়ে গেছে। আবার রাজধানী ঢাকা থেকে যারা নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন, তাদের ঈদের খুশি ¤œান করেছে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটসহ যাত্রাপথে নানা ভোগান্তি।
তবু ঈদ বলে কথা। বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেছেন, ঈদ মানে খুশি। পাশাপাশি কোরবানির ঈদ ত্যাগেরও। বন্যা ও করোনায় যাদের হারিয়েছি, তাদের জন্য দোয়া করতে হবে। ঈদের খুশিতে তাদের যেন ভুলে না যাই।
পবিত্র কোরআনের বর্ণনানুযায়ী, চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার সবচেয়ে প্রিয় নিজ সন্তান হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। তবে আল্লাহর কুদরতে হজরত ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে একটি দুম্ব কোরবানি হয়। হজরত ইব্রাহিমের (আ.) এই ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্মরণ করে প্রতিবছর মুসলমানরা কোরবানি করেন। তবে আল্লাহর পথে ত্যাগই ঈদুল আজহার প্রধান শিা। পশু জবাই করে তা বিলিয়ে দেওয়া দান নয়, ত্যাগ। কবি নজরুল বলেছেন, ‘চাহি নাকো দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’
সামর্থ্যবানরা নিজেদের নামে, প্রিয়জনের নামে পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে সচেষ্ট হবেন। যাদের সামর্থ্য নেই তারাও বাদ যাবেন না ঈদের আনন্দ থেকে। কোরবানির মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার বিধান রয়েছে ইসলামে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলেও পরের দু’দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ তারিখেও পশু কোরবানি দেওয়া যায়। সেই হিসাবে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারও কোরবানি করা যাবে।
পছন্দের পশু কোরবানি করতে সবার এখন ‘গরুখোঁজা’ দশা। সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ দিয়ে সেরা গরু, ছাগল কেনার জন্য ছুটছেন হাট থেকে হাটে। কয়েক বছর ধরে অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। তাই পশুর খোঁজে কেউ কেউ চোখ রাখছেন কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে। বিশেষ করে এই করোনা মহামারিতে সংক্রমন ঠেকাতে হাট বাজাওে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর সরকারী ভাবে জোরদার উদ্যোগের কথা বলা হলেও তার লেশ মাত্র লক্ষ্যকরা যাচ্ছে না পশু হাটে। আর এর ফলে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন বাড়ার আশংকায় অনেক সচেতন মানুষ ঈদেও কোরবানীর পশুটি কিনতে অন লাইনেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে যশোরের জেলঅ প্রশাসন জেলঅ পশু সম্পদ অধিদপ্তর ও ইউনিয়ন ইসেবাকেন্দ্রেও যৌথ উদ্যোগে অন লাইন “যশোরহাট ডট কম” নামে একটি কোরবানীর পশু ক্রয় বিক্রয়ের প্লাট ফরম চালু করেছেন। এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেক খামারী তাদেও খামারের পশু ক্রয় বিক্রয়ের জন্য একটি অন লাইন প্লাটফরম দাড় করিয়েছেন।
এদিকে প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করতে পথের ভোগান্তি মাথায় নিয়ে কোটি মানুষ শহর, কর্মস্থল ছেড়ে গিয়েছেন কিংবা যাচ্ছেন প্রিয়জনের কাছে। আজ থেকে শুরু হয়েছে ঈদের ছুটি। তবে গত সোমবার শেষ কর্মদিবস থেকেই পুরোদমে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। মহাসড়কে যানজট, ফেরিতে দীর্ঘ লাইন, ট্রেনে বিলম্ব- সব উপো করে ‘পথের কান্তি ভুলে’ স্বজনের কাছে ফিরছেন মানুষ।
আগামীকাল সকালে পরিস্কার অথবা নতুন পোশাক পরে সব বয়সী মানুষ শরিক হবেন ঈদের জামাতে। এক কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করবেন ঈদের নামাজ। ভুলে যাবেন সব ভেদাভেদ।
এদিকে গত ঈদুল ফিতরের নামাজ করোনা মহামারির কারনে ঈদগাহের পরিবর্তে স্ব স্ব এলাকার মসজিদ গুলোতে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার সরকারী ভাবে ঈদেও জামাত ঈদগাহে করা যাবে মর্মে ইতিমধ্যে ঘোষনা দেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের ঈদ জামাত অধিকাংশ পাড়া মহল্লার ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে। তবে করোনার প্রার্দুভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় কোন কোন জায়গায় ঈদের জামাত মসজিদেই অনুষ্ঠিত হবে। অপরদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারনে এবার যশোরে ঈদের প্রধান জামাত ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে না।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কোরবানি আমাদের মাঝে আত্মদান ও আত্মত্যাগের মানসিকতা সঞ্চারিত করে। কোরবানির মর্ম অনুধাবন করে সমাজে শান্তি ও কল্যাণের পথ রচনা করতে আমাদের সংযম ও ত্যাগের মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে। ত্যাগের শিা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হলেই প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও সৌহার্দ্য।’ প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘শান্তি, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিা দেয় ঈদুল আজহা। তাই আসুন, আমরা সকলে পবিত্র ঈদুল আজহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কাজে অংশ নিয়ে বৈষম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিকরা। কোরবানির তাৎপর্য ও গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রগুলো। আগামীকাল থেকে ৪ দিন বন্ধ থাকবে যশোরের সংবাদপত্রসমুহ। ফলে আগামীকাল বুধবার থেকে পরবর্তী শনিবার পর্যন্ত যশোরের কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে না। রোববার থেকে যথারীতি পাঠকের হাতে পৌঁছাবে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ঈদ উপলে সাত দিনের বিশেষ বিনোদন অনুষ্ঠান প্রচার করবে।















