পরিবেশ ও জলাধার আইন অমান্য করে যশোরে একের পর এক পুকুর ভরাট হচ্ছে

0
658

মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর : কোন নিয়ম আইন না মেনে যশোর শহর, শহরতলী ও গ্রামে একের পর এক পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভরাটকারিরা কোন মানবিকতা, সরকারি আইন বা সামাজিক বাঁধা কে আমলে নিচ্ছেনা। আর সরকারের আইনে পুকুর ভরাটে নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক স্থানীয় নেতা, মাস্তানদের অপব্যবহার করে জমি মালিকরা বা তাদের প্রতিনিধিরা পুকুর ভরাট করছে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরণ আইন-২০০০ অনুযায়ি কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ি, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। ১৯৫১ সালের পরিবেশ আইন অনুযায়ী কোন মৎস উৎপাদনকারী পুকুর দীঘি পরিবেশ ও মৎস অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া ভরাট করা যাবে না। সূত্র জানায়, অতি সম্প্রতি যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া মৌজায় ১৬টি, বারান্দী মৌজায় পাঁচটি, খড়কী মৌজায় ২৩ টায়, পালবাড়ী মৌজায় ১৪ টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ বা জলাধার সংরক্ষন আইন ২০০০ অমান্য করেছেন পুকুর ভরাটকারিরা। রেলগেটস্থ চোরমারা দিঘী রাতের আধারে ভরাট হয়ে গেছে। ২৬ বিঘা আয়তনের সেই ভরাটকৃত দীঘিটি এখন প্লট করে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন ভোর ফজরের আজানের আগে ও রাত ১০ টার পরে ট্রাক বা ড্যাম্প ট্রাকে মাটি ভরে এনে তা ভরাট করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়। একই ভাবে শহরের সকল পুকুর ভরাট হয়েছে বলে জানান স্ব স্ব এলাকার মানুষজন। এর ফলে নির্জন সুন্দর পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে যশোরে। আশঙ্কাজনক হারে শহরতলী ও গ্রামেও পুকুর ভরাট হয়ে সেখানে নানা স্থাপনা নির্মান হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁচড়া বাজার মোড়ে পাকা রাস্তা সংলগ্ন কয়েকটি পুকুর গত ২/৩ বছরে ভরাট হয়েছে সকলের চোখের সামনে। একই নিয়মে প্রভাবশালীরা তা ভরাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ডাকাতিয়া দণিপাড়ার শহর আলী সরদার নায়েব, মৃত কোবাদ আলী সরদারের ছেলেরা, ডাক্তার ফজলুর রহমান, মিলন মাস্টার, মাওলানা আতিয়ার রহমানের ছেলে মিরাজ তাদের পুকুরগুলো ভরাট করিয়ে নিচ্ছেন। এদের মধ্যে ডাক্তার ফজলুর রহমান প্রায় দেড় লাখ টাকার চুক্তিতে ঠিকাদার নিযুক্ত করে সাইড দেখাশুনাকারী মিজানুর রহমান ও ঠিকাদার নিযুক্ত প্রকৌশলী তুষারের মাধ্যমে তার বিশাল পুকুর ভরাট করিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া শহর আলী ১৬ হাজার টাকা, মৃত কোবাদ আলীর ছেলেরা ১০ হাজার টাকা, মিলন মাস্টার ৩০ হাজার টাকা ও মিরাজ ৫ হাজার টাকার চুক্তিতে মাটি ভরাট করাচ্ছেন। একইভাবে এর আগে মোটা অংকের টাকায় ডাকাতিয়ার কায়েম মোল্লা, জয়নাল আবেদীন, আব্দুর রশিদ, সোহেল রানা, আনোয়ার হোসেন, নুরুল ইসলাম ও মৃত নজিবুলের দুই মেয়ে তাদের পুকুর ভরাট করেছেন। এভাবে নদ খনন করে বিল তুলছেন ঠিকাদারিপ্রতিষ্ঠান আর ঠিকাদার নিযুক্ত লোকজন মাটি দিয়ে করছে বেশুমার ব্যবসা। এতে করে ওই এলাকা পুকুর শুন্য হতে চলেছে। এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এভাবে পুকুর ভরাট করা হলে পরিবেশের মারাত্মক তি হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশ পরিবেশ সংরণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ধারা ৬ (ঙ) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যা একই আইনের ধারা ১৫ (১)-এর ক্রমিক ৮ অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক হারুন অর রশীদ জানান, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরণ আইন উপো করে পুকুর ভরাট করা চলবে না। এ আইন উপো করে যদি পুকুর ভরাট করা হয় তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে রেকর্ড করা পুকুরগুলো জলাধার সংরণ আইন-২০০০ এর ২ (চ) ধারায় প্রাকৃতিক জলাধারের সংজ্ঞাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত মামলার রায় পাওয়ার এক বছরের মধ্যে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সচিবকে এ আদেশটি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। গেজেট প্রকাশিত হলে, ব্যক্তি মালিকানার পুকুরও চাইলেই ভরাট করে ফেলা যাবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরণ আইন, ১৯৯৫ ( ১৯৯৫ সনের ১ নং আইন ) ‘জলাধার’’ অর্থ নদী, খাল, বিল, হাওড়, বাওড়, দীঘি, পুকুর, ঝর্ণা বা জলাশয় হিসাবে সরকারী ভূমি রেকর্ডে চিহ্নিত ভূমি, বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা সরকারী কোন সংস্থা কর্তৃক সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা ঘোষিত কোন জলাভূমি, বন্যা প্রবাহ এলাকা, সলল পানি ও বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোন ভূমি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমন এবং পরিবেশ সংরণ ও উন্নয়ন সম্পর্কে সরকার, সময় সময়, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিবেশ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও জারী করিতে পারিবে৷অপরাধের বর্ণনা, আরোপণীয় দন্ড ১। ধারা ৪ এর উপ-ধারা (২) বা (৩) এর অধীন প্রদত্ত নির্দেশ অমান্যকরণ প্রথম অপরাধের েেত্র অন্যূন ১ (এক) বৎসর, অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদন্ড বা অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা, অনধিক ২ (দুই) ল টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড ; পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের েেত্র অন্যূন ২ (দুই) বৎসর, অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদন্ড বা অন্যূন ২ (দুই) ল টাকা, অনধিক ১০ (দশ) ল টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড। ২। ধারা ৫ এর উপ-ধারা (১) এর অধীনে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষিত এলাকায় নিষিদ্ধ কর্ম বা প্রক্রিয়া চালু রাখা বা শুরুর মাধ্যমে উপ-ধারা (৪) লংঘন প্রথম অপরাধের েেত্র অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদন্ড বা অনধিক ২ (দুই) ল টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড ; পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের েেত্র অন্যূন ২ (দুই) বৎসর, অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদন্ড বা অন্যূন ২ (দুই) ল টাকা, অনধিক ১০ (দশ) ল টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড। ব্যক্তি মালিকানার পুকুর প্রাকৃতিক জলাধার: হাইকোর্ট। ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর প্রাকৃতিক জলাধার বলে হাইকোর্টের এক রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে মহানগর ও বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকায় অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে রেকর্ডভুক্ত পুকুরগুলো ২০০০ সালের জলাধার সংরণ আইনের ২ (চ) ধারায় প্রাকৃতিক জলাধারের সংজ্ঞাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সচিবকে রায় পাওয়ার এক বছরের মধ্যে ওই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ চলতি বছরের ২০২০ সালের ৫ মার্চ ওই রায় দেন। ১০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি হাতে পেয়েছেন বলে জানান রিটকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বরিশাল শহরের ঝাউতলা এলাকায় প্রায় শতবর্ষী পুকুর ভরাট ও দখল বন্ধে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পে ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। এর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুলসহ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তর যশোর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ সাঈদ আনোয়ার জানান, তাদের জানার মধ্যে যশোরে নিয়ম না মেনে কেউ পুকুর ভরাট করতে পারছেনা। অভিযোগ পেলেই তারা সেখানে হাজির হয়ে তদন্ত পূর্বক অফিসিয়াল ব্যবস্থা গ্রহন করেন। অতি সম্প্রতি তাদের একটি টিম পুলিশ প্রশাসনসহ চাঁচড়া টু শঙ্করপুর টার্মিনাল রোড সংলগ্ন মন্দিরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি পুকুর ভরাট বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। ঘোপ ডি. আই. জি (প্রিজন) রোড, শেখহাটি এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়টি অবস্থিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here