যশোরে শিশু হত্যা, সন্তানহারা মা-বাবার আর্তনাদ হত্যাকারীদের শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন-বিক্ষোভ

0
241

যশোর অফিস : যশোরে শিশু সানজিদা জান্নাত মিষ্টি (৪) হত্যার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। আরবপুর ইউনিয়নবাসীর ব্যানারে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় প্রেসক্লাব যশোরের সামনে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিলটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। ডিসি অফিস চত্বরে অবস্থান নিয়ে প্রায় ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে এলাকাবাসী। এতে ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে অংশ নিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান নিহত শিশু সানজিদার মা-বাবা। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের কাঁদতে দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত অনেকেই। এসময় জেলা প্রশাসক চত্বরে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
গত ১ অক্টোবর দুপুরে নিজ বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয় সানজিদা জান্নাত মিষ্টি। পরিবারের লোকজন তাকে খুঁজে ব্যর্থ হয়ে ঐদিনই যশোর কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে সানজিদার প্রতিবেশী আঞ্জুয়ারা বেগমকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে সে হত্যার কথা স্বীকার করে এবং ঐদিন দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বাড়ির চালের ড্রাম থেকে সানজিদার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সানজিদার পিতা সোহেল রানা আঞ্জুয়ারার স্বামী রেজাউলসহ চারজনের নামে মামলা দায়ের করলে পুলিশ আঞ্জুয়ারার আরও দুই সহযোগী মামলার আসামি আব্দুল মালেক গাজী ও তার স্ত্রী খাদিজা বেগমকে আটক করে। সানজিদা হত্যাকান্ডের ঘটনায় আটক আঞ্জুয়ারা খাতুনকে রবিবার আদালতে সোপর্দ করা হয়। তিনি পূর্ব আক্রোশে সানজিদাকে খুন করেছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম জবানবন্দি শেষে তাকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন। এই ঘটনায় আঞ্জুয়ারার আরও দুই সহযোগী মামলার আসামি আব্দুল মালেক গাজী ও তার স্ত্রী খাদিজা বেগমকে সোমবার আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে এ মামলার আসামি আঞ্জুয়ারার স্বামী রেজাউল পলাতক রয়েছে।
জেলা প্রশাসকের চত্বরে বিক্ষোভকালে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে একমাত্র সন্তান হত্যার বিচারের ফরিয়াদ জানান শরিফা খাতুন। এ সময় তিনি বলেন, ‘খুনিরা আমার বুক খালি করেছে। তারা আমার এতিম করেছে। সানজিদার জন্য আমার বুক হাহাকার করছে। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই। তাদের ফাঁসি হলেই আমার বুকের জ্বালা মিটবে।’ ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সানজিদার বাবা সোহেল রানাও। বারবার বুক চাপড়াতে চাপড়াতে তিনি বলেন, ‘এই দুনিয়ার মানুষ! আমার বুকের মধ্যে হাহাকার কারে দেখাবো। আমার যে একমাত্র সন্তানরে হারিয়েছি। কত আদরের বুকের ধন ছিল সানজিদা। আমার বুকের ধন হত্যাকারী, ঐ পাচারকারী আঞ্জুয়ারাসহ তার সাথে থাকা সকল খুনিদের ফাঁসি চাই।’ এ কথা বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। এর পাশেই শাড়ির আঁচল মাটিতে পেতে নাতনি হত্যার বিচার চান সানজিদার বয়স্ক দাদি রহিমা বেগম। তিনি ভালোভাবে হাঁটতে পারেন না। তারপরও লোকজনের সহযোগিতায় মানববন্ধনে ছুটে এসেছেন নাতনি সানজিদার খুনিদের বিচারের দাবি জানাতে। এরপর নাতনির জন্য অঝোরে কাঁদলেন। তাকে কাঁদতে দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত অনেকেই। কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, খুব আদরের ছিল নাতনিটা। আদর করে মিষ্টি বলেই ডাকতাম। নাতনিটাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করার স্বপ্ন ছিল। প্রশ্ন করেন, ছোট্ট সোনার কী দোষ করে ছিল যে তাকে হত্যা করতে হবে? কেন তাকে অল্প বয়সেই এই দুনিয়া ছেড়ে যেতে হলো? তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নাতনি হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।
মানববন্ধনে সানজিদা হত্যার বিচারের দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করে এলাকাবাসী। এছাড়া মানববন্ধনে এ সময় তারা ‘বিচার চাই, বিচার চাই/ আঞ্জুয়ার বিচার চাই/ পাচারকারীর বিচার চাই’ বলে বিভিন্ন শ্লোগান দেন। এর আগে, প্রেসক্লাব যশোরের সামনে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন আরবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাহিদুল ইসলাম, নারী ইউপি সদস্য সাহিদা ইয়াসমিন, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সদর উপজেলা সভাপতি তিমির ঘোষ জয় প্রমুখ।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক আঞ্জুয়ারা স্বামীসহ বর্তমানে সদর উপজেলার বি-পতেঙ্গালী গ্রামে বসবাস করেন। আঞ্জুয়ারা ও তার স্বামী রেজাউল ওরফে রেজা মাদক, চোরাচালানী ও পাচারকারী দলের সদস্য। তাদের বাড়ি বেনাপোলের পুটখালী হলেও বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে। আঞ্জুয়ারা ও তার স্বামী রেজার বিভিন্ন অপকর্মের খবর জানতেন সানজিদার মা শরিফা খাতুন। এছাড়া আঞ্জুয়ারার অপূর্ব হাসান নামে ৭ বছর বয়সের শারীরিক প্রতিবন্ধী একটি ছেলে আছে। মাঝেমধ্যে খেলাধুলা করার সময় সানজিদার সাথে অপূর্ব হাসানের হাতাহাতি ও মারামারি হয়। মাঝেমধ্যে অপূর্ব হাসানকে পাগল বলেও গালি দিত সানজিদা। সব মিলিয়ে সানজিদার পরিবারের প্রতি প্রতিহিংসা জন্ম নেয়ায় তাদের ক্ষতি করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকেন আঞ্জুয়ারা ও তার স্বামী রেজা। এরই সূত্র ধরে শনিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে আপেল খাওয়ানোর কথা বলে বাড়িতে ডেকে সানজিদা মিষ্টিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম বলেছেন, সানজিদা জান্নাত মিষ্টি হত্যাকান্ডের ঘটনায় তিন আসামি কারাগারে। এখনও এক আসামি পলাতক রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here