মাশরুম চাষে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে যশোরের নারী উদ্যোক্তা উম্মে ছালমা

0
553

তরিকুল ইসলাম : মাশরুম চাষই একমাত্র আয়ের উৎস্য। যা দিয়ে তিনটি মেয়ের লেখাপড়া খরচসহ পরিবারের যাবতীয় খরচ মেটানো হয়। চাষের সফলতায় পরিবারে নেমে এসেছে স্বচ্ছলতার ছোয়া। স্বামীর প্রশিক্ষনকে কাজে লাগিয়ে মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে দক্ষিনাঞ্চলে নাম ছাড়াচ্ছে নারী উদ্যোগী উম্মে ছালমা।
স্বামী আয়ূব হোসেন একসময় সিনেমা হলে কাজ করতেন। কোন রকমে চলত তার সংসার। কিছু একটা করার নেশায় তার মাথায় আসে মাশরুম চাষ। ছুটে যান সাভারের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে । সে সময় পরিচালক ছিলেন যশোরের শেখ রুহুল আমিন। তিনদিনের প্রশিক্ষন শেষে ৩০পিচ মাশরুম বীজ (মন্ড থেকে তৈরী) দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে এসে আয়ূব হোসেন শুরু করেন মাশরুম চাষ। আয়ুব হোসেন কে সহযোগিতা করতো তার স্ত্রী উম্মে ছালমা। আজ তারা মাশরুম পরিবার হিসাবে পরিচিত। শহর থেকে একটু দুরে মুড়লি মোড়ে যশোর বেনাপোলো সড়কের পাশে ৫ শতক জমির উপর এই পরিবারের বসবাস। ছয় সদস্য’র পরিবারের একমাত্র সম্বল বসতবাড়ি। বর্তমানে উম্মে ছালমা তিন মেয়েকে সাথে নিয়ে বাড়িতে মাশরুম চাষ চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে আয়ূব হোসেন প্রশিক্ষক হিসাবে মাশরুম চাষের উপর বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষন দিচ্ছেন। বর্তমানে তিনি যশোর যুব উন্নয়ন কেন্দ্রে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যান্য সবজির মত মাশরুমের কোন বীজ নেই, বীজ তৈরী করে নিতে হয় জানালেন আয়ূব হোসেন।
বীজ তৈরীর পদ্ধতি : কাটের ভূসি, গমের ভূসি, ধানের তুষ ও ক্যালসিয়াম কার্বনেট পানির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে মন্ড তৈরী করতে হবে। এরপর মন্ড পলিথিনের একটি ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে শক্ত করতে হবে। নেক (প্লাসটিকের তৈরী একধরনের আংটা) দিয়ে আরো বেশি শক্ত করে তুলার দলা ব্যাগের মুখে বসিয়ে রাবার দিয়ে আটকিয়ে দিতে হবে। এরপর বাস্পায়িত কে ব্যাগ জীবানুমুক্ত করতে হবে। ঠান্ডা হয়ে গেলে ইনোকুলেশন বক্সে রেখে কালচার (মাশরুমের ফুলের অংশ) স্থানান্তর করা হয়। সেটাকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ঘরে রেখে দিতে হবে ২০ থেকে ২৫দিন। এর পর ব্যাগের মুখ থেকে ফুল বাহির হবে যেটা মাশরুমের বীজ হিসাবে পরিচিত। এই ফুল ৭দিন পর মাশরুম হিসাবে সংগ্রহ করা হয়।
উম্মে ছালমা বলেন, বর্তমানে ঢাকার সাভার থেকে শুরু করে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, ও সাতক্ষীরা জেলার মাশরুম চাষীরা আমার কাছে বীজ কিনতে আসে। তিনি জানান, মাশরুম থেকে তৈরী চপ, বড়া, ফ্রাই,আচার অনেক সুস্বাধু। মাশরুমের গুড়া থেকে তৈরী হয় বিস্কুট, স্যুপ, কেক, জেলি। এছাড়া তরকারি বা মাছ-মাংশের সাথে রান্না করে মাশরুম খাওয়া যায়।
ডাক্তারের ভাষায় আবর্জনায় উৎপন্ন মাশরুম না খেয়ে শুধু চাষ করা মাশরুম খেতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান থাকায় এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক মতা বৃদ্ধি করে। মাশরুমে মানুষের শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পলিফেনল ও সেলেনিয়াম নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মারাত্মক কিছু রোগ, যেমন- স্ট্রোক, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ এবং ক্যান্সার থেকে শরীরকে রা করে। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। নিয়মিত মাশরুম খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া মাশরুমে বিদ্যমান এনজাইম ও প্রাকৃতিক ইনসুলিন থাকায় এটি খেলে দেহের অতিরিক্ত চিনি ভেঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভুমিকা রাখে উম্মে ছালমা বলেন মাশরুম এমন একটি সবজি যা উৎপাদনে কোন জমির প্রয়োজন হয় না। ঘরের কোনায়, রান্না ঘরের কোনায়, একটু খানি জায়গা হলেই মাশরুম উৎপাদন করা যায়। আবার এ চাষে খরচও কম। মাশরুমের বীজ , মাশরুম, এবং গুড়া মাশরুম তৈরী বিভিন্ন খাবার বিক্রি করে মাসে তিনি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন। উম্মে ছালমা বলেন, মাশরুমের তৈরী বিভিন্ন রকম খাবার দিয়ে শহরের মধ্যে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারলে সাধারন মানুষের মধ্যে এর প্রয়োজনীয়তা যেমন ছড়িয়ে পড়তো। তেমনি মাশরুম চাষের প্রসার ঘটতো। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আমার কাছে নেই। সরকারিভাবে কোন সুযোগ সবিধা সে পাইনি। কর্মসংস্থান ব্যাংকের সাথে যোগযোগ করা হলে সেখান থেকে কোন ঋণ পাওয়া যায়নি। এনজিও থেকে যে ঋণ পাওয়া যায় সেখানে সুধের হার বেশী। যশোর কর্মসংস্থান ব্যাংকের ব্যবস্থাপক তবিবর রহমান জানান, আমি এখানে সপ্তাহখানেক যোগদান করেছি। আমার দায়িত্ব ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তাদের পাশে দাড়ানো। তাই কোন উদ্যোক্তা ঋণের জন্য আবেদন করলে আমি দায়িত্ব নিয়ে তার প্রকল্প পরিদর্শন করবো এবং ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত হলে অবশ্যই সে ঋণ সহযোগীতা পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here