মণিরামপুর ( যশোর ) প্রতিনিধি: মনিরামপুর উপজেলায় সাংবাদিক পরিচয়ধারী একটি চক্রের নানা অপকর্ম ও দৌরাত্মে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে শান্তিপ্রিয় মানুষ। কতিথ একটি সংগঠনের ছায়াতলে থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, হয়রানী, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছে তারা।এছাড়া ফেসবুকে বিভিন্ন ভূয়া আইডি খুলে সম্মানিদের সম্মান হানীর অভিযোগ রয়েছে। ফলে অপসাংবাদিকার শিকার ভূক্তভোগী এক নারীর জুতাপেটার শিকার হন জাকির হোসেন নামে এক সাংবাদিক নামধারী। তবে অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং তাদের প্রতিহত করতে মনিরামপুর প্রেসক্লাব আগামি শনিবার মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষনা করেছে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, মনিরামপুর প্রেসক্লাবের আদলে ২০২২ সালে ‘উপজেলা প্রেসক্লাব’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন পৌর যুবলীগ সভাপতি এসএম লুৎফর রহমান। আর এ সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী কতিথ কবিরাজ সুমন চক্রবর্তী। সাংবাদিকতার আড়ালে নানা রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডের এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই এটি প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীদের। তবে ২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওই যুবলীগ নেতা গা ঢাঁকা দিলে নেতৃত্ব সংকটে পড়ে সংগঠনটি। এরপর সুমন চক্রবর্তি ও আব্দুল্লাহ আল মামুন ঢাকুরিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক সাংগঠনিক সেক্রেটারী জাকির হোসেনের আশ্রয়ে থেকে বেশ কয়েকজনকে নিয়ে উপজেলা প্রেসক্লাবের সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে গঠন করেন রিপোর্টার্স ক্লাব নামের সংগঠনটি। এর পর থেকে জাকির হোসেন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা জামায়াতের আমীর সহকারি অধ্যাপক ফজলুল হকের ছত্রছায়ায় থেকে জাকির হোসেন রিপোর্টাস ক্লাবটির সভাপতি এবং সম্পাদক হন আব্দুল্লাহ আল মামুন। এমনটি দাবি করেছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সহসভাপতি এসএম তাজাম্মুল।
ভুক্তভোগীদের একজন যশোরের মুড়লী এলাকার বাসিন্দা জিয়ার আলী বলেন, দুই বছর আগে মনিরামপুরের ব্রক্ষপুর গ্রামে নয় লাখ টাকায় ছয় শতক জমি ক্রয় করেন। এ সময় সাংবাদিক ও জামায়াত নেতা পরিচয় দিয়ে জাকির হোসেন তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও জাকিরকে চাঁদার টাকা না দেওয়ায় এখন পর্যন্ত সেই জমি দখলে নিতে পারেননি তিনি। শুধু জিয়ার আলী নয়, জাকির ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের অপকর্মের হাত থেকে রেহাই পাননি প্রতিবেশী, ভ্যানচালক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি মসজিদের মুয়াজ্জিনও। ঢাকুরিয়ার কৃষক হাফিজুর রহমান, মুয়াজ্জিন আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী জাকিরের প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে ধরেন। জাকিরের প্রতারনার শিকার ভ্যানচালক সোবহান আলীর অভিযোগ, বিগত সরকারের একটি মিথ্যা মামলায় তিনি ৪৩ মাস জেল খাটেন। এ দিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাকা বাড়ি, একটি প্রাইভেট, একটি মাইক্রো, নিজস্ব অফিসসহ অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকার মালিক বনে গেছেন এই জাকির হোসেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. রাফসান জানীর অভিযোগ, তার মানষিক ভারসাম্যহীন শ্যালিকা সামিয়া আফরোজকে কৌশলে আটকে রেখে ধর্ষণ মামলার ভয় দেখিয়ে জাকির তার সহযোগী মামুন, নাহিদসহ তার অন্যান্য সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এছাড়া তার শ্যালিকাকে নিয়ে ফেসবুকে কুরুচিপূর্ন মন্তব্য করায় ক্ষিপ্ত হন সামিয়া আফরোজ ও তার পরিবার। ফলে গত বুধবার দুপুরের দিকে পৌরশহরের সোনালী ব্যাংকের পাশে একটি মার্কেটের মধ্যে পেয়ে জাকির হোসেনকে জুতাপেটা করেন সামিয়া আফরোজ। এ সময় জাকিরের প্রধান সহযোগী আব্দুল্লাহ আল মামুন সেখান থেকে সটকে পড়েন। জুতাপেটার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহুর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। অবশ্য জাকিরদের অপকর্মের কারনে ইতিমধ্যে রিপোর্টার্স ক্লাব থেকে পদত্যাগ করেছেন সহসভাপতি এসএম তাজাম্মুল, প্রচার সম্পাদক আবু রায়হান, কার্য নির্বাহী সদস্য সাজ্জাদুল ইসলাম ও প্রদী কুমার মন্ডল। এর মধ্যে পদত্যাগকারী এসএম তাজাম্মুল বলেন, জাকিরদের অপতৎপরতা ও অপসাংবাদিকতার প্রতিবাদে তিনিসহ চারজন পদত্যাগ করেছেন। এ ব্যাপারে মনিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এসএম মজনুর রহমান বলেন, সাংবাদিক পরিচয়ধারী একটি মহলের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিং, হয়রানী, চাঁদাবাজি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্মানহানি, সরকারি অফিসে অপতৎপরতাসহ নানা অপকর্মেও অভিযোগ উঠেছে। সাধারন সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে গনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দোষিদেও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আগামি শনিবার বিকেল ৩টায় মনিরামপুর প্রেসক্লাবের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হবে। তবে অভিযুক্ত জাকির হোসেন তার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন। উপজেলা জামায়াতের আমির সহকারি অধ্যাপক ফজলুল হক জাকিরকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জাকির জামায়াতের প্রচার সেলের সদস্য। কিন্তু সে জামায়াতের কোন পদে নেই। তিনি আরো জানান, জাকিরের অপকর্মের দায়ভার কোন অবস্থাতেই সংগঠন বহন করবেনা। মনিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু সাঈদ জানান, এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করা হলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।














