‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’

0
9

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের তৎকালীন রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপথ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছিল।
পটভূমি : ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পটভূমি গড়ে উঠেছিল ওই বছরের বেশ কয়েকটি নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে:
১.১৫ আগস্টের পটপরিবর্তন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা শুরু হয়।
২.৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান: সেনাবাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলার অভাব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পদত্যাগে বাধ্য করে তাঁর বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয় এবং সেনাপ্রধান হন খালেদ মোশাররফ।
৩.জেলহত্যা ও বিভ্রান্তি: ৩ নভেম্বরের অস্থিরতার সুযোগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই সময়ে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে ঘিরে সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, এই অভ্যুত্থানের পেছনে প্রতিবেশী দেশের প্রভাব রয়েছে। এতে সাধারণ সৈনিক ও জনতার মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম হয়। ৪.জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং তাদের সামরিক শাখা ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ (লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে) সাধারণ সৈনিকদের দাবি-দাওয়া ও ক্ষোভকে সংগঠিত করে এক সর্বাত্মক বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেয়।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ : ৭ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁরা বন্দিদশা থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনেন। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীরা নিহত হন। মুক্তির পর সিপাহি ও ঢাকার সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। তাঁরা জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে উল্লাস প্রকাশ করেন এবং সিপাহি-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন—”সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই”। এক অভূতপূর্ব ঐক্য বা ‘সংহতি’ দৃশ্যমান হয়, যা থেকে এই দিনটির নাম হয় ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’।
তাৎপর্য ও গুরুত্ব :
১.জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা: এই দিবসের প্রধান তাৎপর্য হলো, এটি দেশের তৎকালীন চরম রাজনৈতিক শূন্যতা ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা থেকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে সুসংহত করেছিল বলে এর সমর্থকেরা মনে করেন।
২. জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় উত্থান: ৭ নভেম্বরের ঘটনার মধ্য দিয়েই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন। পরে তিনি উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৩. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারার পরিবর্তন: এই পটপরিবর্তনের ফলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) পরবর্তী অচলাবস্থা কাটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার সূচনা হয় এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বদলে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে দেশের অর্থনৈতিক নীতি মোড় নেয়।
৪.বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি: পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান যে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’–এর রাজনৈতিক দর্শন প্রবর্তন করেন, তার মূল চেতনা হিসেবে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যকেই তুলে ধরা হয়।
৭ নভেম্বরের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের সমমনা দলগুলো দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে; অন্যদিকে জাসদ এটিকে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ এবং আওয়ামী লীগসহ কিছু রাজনৈতিক শক্তি একে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে বিবেচনা করে। তবে সামগ্রিকভাবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নির্ণায়ক অধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here