​ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতা, এবারও হলো না ৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ

0
128

রাহাত আলী,মনিরামপুর : ​আকাশের মেঘ কাটলেও কাটেনি ভবদহ পাড়ের মানুষের কপাল।
মাঠের পর মাঠ প্রান্তর জুড়ে যেখানে এখন সবুজের সমারোহ
থাকার কথা, সেখানে কেবল অথৈ পানির বিস্তার। কোথাও
কোমর সমান, কোথাও বুক সমান জল। বিলের সেই জল যেন
কৃষকের চোখের জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে।
জলাবদ্ধতার অভিশাপে যশোরের ভবদহ অঞ্চলে এবারও প্রায় ৭ হাজার
২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা সম্ভব হয়নি। সরকারি
হিসেবে আবাদ বাড়ার দাবি করা হলেও বাস্তবের ছবিটা বলছে
ভিন্ন কথা।
​যশোরের মনিরামপুর, অভয়নগর, কেশবপুর এবং খুলনার
ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত এই ভবদহ
অঞ্চল। এখানকার ৫২টি ছোট-বড় বিলের পানি একসময়
মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী দিয়ে নেমে যেত। কিন্তু পলি
জমে নদীগুলোর নাব্য হারিয়ে যাওয়ায় এখন পানি নিষ্কাশন
স্থবির হয়ে পড়েছে। গত বর্ষার সেই পচা পানি এখনও নামেনি
বিল থেকে। ফলে ৫০ হাজার কৃষকের ভাগ্য এখন অনিশ্চয়তার
সুতোয় ঝুলছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল
ডুমুর ও বিল পায়রাসহ অন্ততঃ ১০টি বিলে শুধু পানি আর
কচুরিপানার রাজত্ব। কিছু কিছু এলাকায় কৃষকেরা নিজেদের
উদ্যোগে বাঁধ দিয়ে সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সরিয়ে চাষের
চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিস্তীর্ণ নিচু এলাকাগুলো রয়ে গেছে
নাগালের বাইরে।
​মনিরামপুর উপজেলার নেবুগাতী গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক বিমল রায়
(৬৮) আক্ষেপ করে বলেন, বিল বোকড়ে আমার ৬ বিঘা জমি
আছে। সেখানে এখনও ৫-৭ ফুট জল। বোরো ধান লাগাবো কী
করে? নদীর ওপারের ৩ বিঘা থেকে দিনরাত জল সেচে কোনোমতে
দেড় বিঘায় ধান লাগিয়েছি। বাকি সব জলবন্দী। একই আক্ষেপ
ঝরল হরিদাসকাটির অসীম ধরের কণ্ঠে। ১৫ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র
৮ বিঘায় চারা রোপণ করতে পেরেছেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই অঞ্চলের ২৪ হাজার ৯০৪
হেক্টর বোরো চাষযোগ্য জমির মধ্যে এবার আবাদ হয়েছে ১৭
হাজার ৬৬১ হেক্টরে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমি
অনাবাদি রয়ে গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে
মনিরামপুরে, যেখানে ৩ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমিতে কোনো
লাঙল পড়েনি।
​তবে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার ১
হাজার ৪ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। যদিও এই
পরিসংখ্যান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক
গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, কৃষি অফিস জলাবদ্ধ জমির যে তথ্য
দিচ্ছে তা বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরও
অনেক বেশি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী পুনঃখননের জন্য শ্রী ও হরি নদীতে
আড়াআড়ি বাঁধ দিয়েছে। কেশবপুর উপজেলা কৃষি
কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, খনন কাজের
জন্য এই বাঁধ দেওয়ায় শেষ সময়ে বিলের পানি নামতে পারেনি।
ফলে অনেক কৃষক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চাষ শুরু করতে
পারেননি।মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা
আক্তার জানান, সেচের সময় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় শেষ
মুহূর্তে অনেক কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে।
​যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ
কুমার ব্যানার্জী জানান, খনন কাজ ও স্লুইসগেটের মাধ্যমে
পানি সরানোর চেষ্টা চলছে বলেই গত বছরের তুলনায় এবার
কিছুটা বেশি জমিতে চাষ সম্ভব হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here