স্টাফ রিপোর্টার : যশোর শহরের নীলগঞ্জ সুপারি বাগান (প্রফেসরপাড়া)
এলাকায় মাদ্রাসার শিক্ষক, অভিভাবক ও সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের
মধ্যে সৃষ্ট বিরোধকে কেন্দ্র করে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের
সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যশোর জেলা আমির
অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টার ঘটনা
ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে এ
ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপি গোলাম রসুলের বাসভবনের সামনে অবস্থিত
আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদে শিশুদের যাতায়াত ও অবস্থান নিয়ে
দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। স্থানীয়রা জানান, শহরের নীলগঞ্জ এলাকা
এমপি গোলাম রসুলের বাড়ির পাশেই ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’
নামের একটি মাদ্রাসা রয়েছে। এই মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণী থেকে
কোরআনের হাফেজ ও মুফতি মাওলানা বিষয়ে পাঠদান করা হয়। এই
মাদ্রাসায় কবির হোসেন নামের এক ব্যক্তি মুহতামিমের দায়িত্ব পালন
করেন। এমপি গোলাম রসুলের মেডিকেল পড়ুয়া মেয়ে মেহেজাবিন
জান্নাত অনন্যা এই মাদ্রাসার মুহতামিম ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের
রাস্তায় প্রায়ই বিঘ্ন সৃষ্টি করতেন। তিনি এই এলাকায় এই
মাদ্রাসাটি চালু থাকুক তা চাননি। এই কারনে নানা ছলে মাদ্রাসার
মুহতামিম ও শিক্ষার্থীদের সাথে অসৌজন্যমুলক ব্যবহার করতেন। তারই
ধারাবাহিকতায় গত সোমবার দুপুরের পরে মাদ্রাসার কয়েকজন
শিক্ষার্থীর চলার পথে রাস্তা আটকে এমপি কন্যা অনন্যা তাদের কে নানা
রকমের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং হুমকি ধামকি দেন। এমনকি তিনি
আয়ানসহ কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলেন। প্রতিবাদ করলে
তিনি রেক্সোনা নামে একজন মহিলার ওপর চড়াও হন এবং ওই মহিলার মাথা
ফেটে যায়। স্থানীয়রা জানান, এমপি কন্যা অনন্যা তার হাতে থাকা
একটি লোহার তালা দিয়ে জোরে আঘাত করায় রেক্সোনা নামের ওই নারীর
মাথা ফেটে যায়। এই হামলার প্রতিবাদ করায় নাসির উদ্দিন নামে এক
ব্যক্তিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে তার সাইকেলটি রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে
দেন এমপি কন্যা অনন্যা ও তার কয়েকজন সহযোগী বন্ধু ও বান্ধবী।
অভিযোগকারী স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার পর সোমবার রাতে
স্থানীয়ভাবে দুই পক্ষের মধ্যে একটি মীমাংসা হয়। তবে মঙ্গলবার সকালে
মাদ্রাসা খুললে অনন্যা পুনরায় সেখানে গিয়ে মাদ্রাসা বন্ধ করার
নির্দেশ দেন এবং মাদ্রাসার মুহতামিম কবির হোসেনের সাথে
অসৌজন্যমুলক আচরন করেন। এতে স্থানীয় অভিভাবকরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে
ওঠেন এবং সকাল ১১টার দিকে এমপির বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে
বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ চলাকালে বেলা সাড়ে
১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে এমপির এক স্বজন ঘটনাস্থলে
এলে ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তার ওপর চড়াও হয় এবং তাকে মারধর করে। এতে
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক
অবরোধ করে এমপি ও তার মেয়ের শাস্তির দাবিতে নানা স্লোগান দিতে
থাকেন। আহত রেক্সোনার ননদ অন্তু অভিযোগ করে বলেন, এমপি সাহেবের
মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যা কারণে-অকারণে মাদ্রাসায় গিয়ে
ঝামেলা করেন। তার ও তার লোকজনের কারনে এলাকায় শিশু শিক্ষার্থীদের
লেখাপড়ার জন্য মাদ্রাসাটি পরিচালনা করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। এ
বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের
স্ত্রী শারমিন ইয়াসমিন জানান, তার মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত
অনন্যা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি দাবি করেন,
মাদ্রাসা বন্ধ থাকলেও শিশুরা বিভিন্ন সময় এখানে এসে গোলযোগ
সৃষ্টি করে। আমার মেয়ে শুধু এর প্রতিবাদ করেছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র
করে আমাদের সাথে শত্রুতা তৈরি করা হয়েছে। এখন অহেতুক আমাদের
বাড়িতে হামলা চালিয়ে মিথ্যা নানা অভিযোগ আনা হচ্ছে। এই বিষয়ে
যোগাযোগ করা হলে এমপি গোলাম রসুল বলেন, একটি তুচ্ছ ঘটনাকে
রং লাগিয়ে হামলাকারীরা তার বাসভবনের জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে এবং
শাবল ও ড্রিল মেশিন দিয়ে প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। এ সময় তাকে
ও তার পরিবারকে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় কয়েক ঘন্টা এবং বাইরে
থেকে বিভিন্ন ধরনের অশালীন গালিগালাজ করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করেন।
তিনি আরও বলেন, তার মেয়ে একজন মানসিক রোগী তার
চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে এবং
প্রয়োজন হলে তদন্তকারী সংস্থার কাছে তা উপস্থাপন করা হবে। একজন
চিকিৎসাধীন মানসিক রোগীর আচরণকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের
ওপর হামলা, ভাঙচুরের চেষ্টা এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি কোনোভাবেই
গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য
উদঘাটন এবং হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা
গ্রহণের দাবি জানান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কোতোয়ালি থানার
পরিদর্শক (অপারেশন) মমিনুল হক জানান, দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, বিক্ষুব্ধ জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা
করা হয়েছে। আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যার সমাধান করা হবে। সর্বশেষ
খবর পাওয়া পর্যন্ত, ঘটনাস্থলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহসান
হাবীব ও র্যাব যশোর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর এ টি এম ফজলে রাব্বি
প্রিন্সসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটিতে কড়া নজরদারিতে রেখেছে।
এদিকে, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ
সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্দেশনায় নগর বিএনপির
সভাপতি রফিকুল ইসলাম মুল্লুক চাঁদ, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব
আনসারুল হক রানা এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আমির
ফয়সাল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারা
উপস্থিত জনতাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা না দেওয়ার
আহ্বান জানান। ঘটনার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যশোর জেলা
শাখা এক বিবৃতিতে বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টার তীব্র নিন্দা
জানিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ
ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে গুজব, উসকানিমূলক
প্রচারণা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো
হয়েছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের
পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Home
যশোর স্পেশাল মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এমপি কন্যার হামলার প্রতিবাদে উত্তেজনা/ যশোর-৪ আসনের এমপির বাসভবনে...














