ইসকনের কালো থাবায় যশোরের চাঁচড়ার ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা মন্দিরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে

0
45

স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে : যশোরের চাঁচড়ায় ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা
মন্দিরের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এই মন্দিরের মুল দাবিদার সনাতনী ধর্মের মানুষদের
এখান থেকে নানা কলাকৌশলে উচ্ছেদ করে গোটা মন্দির ও তৎসহ সম্পত্তি দখলের
অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি
এই দশমাবিদ্যা মন্দির চত্বরে নির্যাতনের পর একটি সনাতনী কিশোরী স্কুল ছাত্রী শিপ্রা
ঘোষের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জলপনা কল্পনা। মন্দির চত্বরে
বসবাসকারীরা বলছেন, তাদের উচ্ছেদের জন্য ইসকন প্রভূ অপার গোবিন্দের নেতৃত্বে
ইসকনপন্থিরা নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদ হয়ে
গেছে। এখন তাদের লক্ষ্য গোটা মন্দির চত্বর গ্রাস করা। স্থানীয় হিন্দু-
মুসলিমনির্বিশেষে বলছেন, ইসকনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর সেখানে উসকানিমূলক
কার্যক্রম চলছে। ফলে যেকোনো সময় আরো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে
ইসকনের ‘সাধুদের’ বিরুদ্ধে নারীঘটিত অভিযোগ ছাড়াও আর্থিক দুর্নীতির
অভিযোগও রয়েছে। স্বয়ং মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ^নাথ দত্বের ভাষ্য, অপার গোবিন্দ
লোকটি সুবিধার নন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ। আর
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতনের মতে, ‘সাধু’ অপার গোবিন্দ
ভালো লোক।
প্রায় ৩ শো বছর আগে যশোরের চাঁচড়ার জমিদাররা তাদের কাছারী বাড়ি সংলগ্ন প্রায়
৫ একর জমির ওপর এই দশমহাবিদ্যা বিগ্রহ মন্দিরটি তৈরী করে পূজা অর্চনা শুরু করেন।
কালের পরিক্রমায় জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়ে গেলেও এই মন্দিরে পূজা অর্চনার প্রচলন
অব্যাহত ছিলো। বৃটিশ শাষনের অবসান হলে এই জমিদারদের বংশধরেরা সব কিছু ফেলে
ভারতে চলে যান। তখন এই মন্দির ও তৎসহ সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক বনে যান
জমিদারদের পাইক বরকনদাসরা।সেই থেকে সনাতনী ধর্মের সেই সব লোকজন এই
দশমহাবিদ্যা মন্দিরকে কেন্দ্র করে বসতি স্থাপন করে বসবাস শুরু করেন। দেশ স্বাধীনের পর
এই পরিবার গুলোর অনেকেই দ্বিতীয় দফায় ভারতে চলে যান। এর মধ্যে মন্দিরের অনেক সম্পত্তি
বেদখল হয়ে যায়। মাত্র ৭৬ শতক জমি ও তৎসহ মন্দিরটি ঘিরে রাখেন ১২টি সনাতনি
পরিবারের সদস্যরা। গত প্রায় তিন যুগ এই পরিবারের সদস্যরা সুখে শান্তিতে এই
দশমহাবিদ্যা মন্দিরকে ঘিরে পূজা অর্চনা করে সময় পার করছিলেন। বেশ কয়েক বছর
আগে সেই পুরোনো মন্দিরের দেওয়াল চাপা পড়ে মারা যান নিরোদ কুমার ঘোষ ও তার ভাই
বিনোদ কুমার ঘোষ। তবুও স্বজন হারানোর ব্যাথা বুকে চেপে এই মন্দিরের পাশে ছোট্ট
ছোট্ট খুপড়ি ঘর তুলে সেখানে বসবাস করছিলেন ৮টি পরিবার। এক পর্যায়ে যশোর –
কলকাতা ভায়া বেনাপোল সড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই দশমহাবিদ্যা মন্দিরের ওপর চোখ
পড়ে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকন কর্তৃপক্ষের।
দশমহাবিদ্যা মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, ২০১৬ সালে ইসকন এখানে
আসে। সেসময় বিমল রায়চৌধুরী, স্বপন ভট্টাচার্য্য, অপু কাপুড়িয়াদের অনুরোধে
কিছু শর্তে ইসকনকে এখানে আসার সুযোগ দেওয়া হয়।
ঢাকা থেকে আসা ইসকনের পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তখন যশোরের প্রভাবশালী
ব্যবসায়ী অপু কাপুড়িয়ার বাড়িতে বৈঠকে বসেছিলেন দশমহাবিদ্যা মন্দির কমিটির
সদস্যরাও। ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় মন্দির কমিটির সদস্যরা এখানে ইসকনকে প্রবেশ
করতে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। সে সময় বিমল রায়চৌধুরী এবং অন্যরা বলেছিলেন, প্রায়
৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরে ওরা (ইসকন) এলে সংস্কার হবে, জমজমাট হবে। ইকসন
একপাশে থাকবে, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের কাজে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। সাধারণ সনাতনিরা
সেখানে দুর্গা, কালীসহ অন্যান্য পূজার আয়োজন করতে পারবেন।
সেসময় বিমল রায়চৌধুরীর মৌখিক প্রস্তাবে ইসকন কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি
দিয়েছিল প্রয়োজনে তিন পুরুষ ধরে মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে বাইরে
দুই কাঠা করে জমি কিনে দিয়ে পুনর্বাসন করা হবে বলে জানান বিশ্বনাথ দত্ত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ইসকনের সাথে তাদের একটা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়।
ইংরেজিতে লেখা সেই চুক্তিটি একজন শিক্ষক পড়ে শোনানোর পর মন্দিরের নেতারা তাতে
সই করেছিলেন। বেশ কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা
ইসকনকে তখন এই দশমহাবিদ্যা মন্দির ক্যাম্পাসে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু
পরবর্তীতে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে ধীরে ধীরে সব শর্ত ভঙ্গ করে আস্তে আস্তে পুরো
মন্দিরটিকে নিজেদের কবজায় নিয়েছে। মন্দির চত্বরে বসবাসকারীদেরকে উচ্ছেদ থেকে
শুরু করে পুরো মন্দিরের যাবতীয় কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তারা।
এ নিয়ে সনাতনিদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করলেও ইসকনের প্রভাবের কারণে কেউ
কিছু বলতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটিকে
ইসকনের কবল থেকে রক্ষা করা যাবে কি না তা নিয়ে খোদ সনাতনিদের মাঝেই সংশয় তৈরি
হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন নেতা অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসের
যৌন হয়রানি ও অসদাচরণের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর দশম
শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা আত্মহত্যা করেছে। শিপ্রার ভাই পাপন আদালতে যে মামলা করেছেন
তাতে তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, মন্দিরের পুরোহিত (প্রভু) অপার গোবিন্দ ও তার
সহযোগীদের যৌন হয়রানি এবং ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তার বোন
শিপ্রা ঘোষ।
স্থানীয় সনাতনীদের দাবি, ইসকন সেখানে প্রবেশের পর কথাতো রাখেইনি, ধীরে ধীরে
মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে। উল্টো ইসকন এখানে আসার আগে
সাধারণ সনাতনিরা অবাধে যেভাবে মন্দিরে যাতায়াত ও পূজা-অর্চনা করতেন তাও
সীমিত করে দেওয়া হয়। তারা আসার পর মন্দিরের প্রধান ফটক অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা শুরু
হয়; নির্দিষ্ট পূজা ও উৎসব ছাড়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকে। এমনকী পর্যায়ক্রমে এখান
থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে তিনটি পরিবারকে।
মন্দির চত্বরে বসবাসকারী মৌসুমি ঘোষ, সুরঞ্জন বিশ্বাস, শুভ ঘোষ, মনি বিশ্বাসসহ
পাশের বাসিন্দা কয়েকজন সনাতনি অভিযোগ করেছেন, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পুরো
নিয়ন্ত্রণ এখন ইসকনের হাতে। মন্দিরটিতে যে বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে তা ইসকন
নিজেদের নামে করে নিয়েছে। পানির লাইনের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। দশমহাবিদ্যা মন্দিরের
দানবাক্স ভরে গেলে ইকসনের লোকেরা নিয়ে ‘প্রভু’ অপার গোবিন্দের হাতে তুলে দেন। তার
একটি টাকাও মন্দিরের কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পায় না পরিচালনা কমিটি।
এমনকী সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান দশমহাবিদ্যা মন্দিরের নামে বরাদ্দ হলেও তা হাতিয়ে
নেন এই ‘প্রভু’। সে কারণে ঐতিহাসিক এই মন্দিরটিতে আদতে পরিচালনা কমিটির
আর কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয় সনাতনিদের।
মন্দির চত্বরে বংশপরম্পরায় বসবাসকারীদের অভিযোগ, মন্দিরটিতে ইসকনের সাধারণ
পূজারির বাইরে অনেক অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা রয়েছে। তারা কোথা থেকে
আসে আবার কোথায় চলে যায়, তা কেউ জানে না। এসব যুবক স্থানীয় নাকি অন্য
কোনো জেলা থেকে এসেছেন তা-ও অজানা। এমনকী তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না তা
নিয়েও সংশয় আছে সাধারণ সনাতনিদের।
মন্দির চত্বরে বসবাসকারীদের অভিযোগ, ইসকনের তৈরি করা ছোট ছোট ঘরে এসব
অপরিচিত যুবক রাতযাপন করেন। তাদের কেউ চলে গেলে আবার অন্যজন আসেন। এসব
কারণে তারা স্ত্রী-কন্যা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে এ ব্যাপারে
অভিযুক্ত ইসকন প্রভূ অপার গোবিন্দের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারন স্কুল ছাত্রী শিপ্রা
ঘোষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সনাতনীদের ভয়ে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here