এহসানুল হোসেন তাইফুর, বিশেষ প্রতিনিধি : যশোরের কেশবপুরে অটো চালক নাজমুল হাসান শান্ত নিজ আয়ের অর্থ দিয়ে এক লাখ বৃক্ষ
লাগানোর কাজ করে চলেছেন। তার এ ব্যতিক্রম উদ্যোগ বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক
দিক হিসেবে দেখছেন। যশোরের ৮ টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে এক লাখ ফলদ ও বনজ বৃক্ষ
রোপনের পরিকল্পনা তার। বৃহস্পতিবার যশোর-চুকনগর সড়কের কেশবপুর উপজেলার মধ্যকুল
আমতলা নামক এলাকায় বৃক্ষ রোপনের সময় শান্ত তার এই ইচ্ছার কথা জানান। ওই ব্যতিক্রম
উদ্যোগ দেখে পথচারীরাও তাকে বাহবা দেন।
নাজমুল হাসান শান্তর বাড়ি কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। সকালে ঘুম থেকে
উঠেই অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রোজগারের জন্য। সারাদিন যাত্রি পরিবহন করে আয়ের
অর্থ দিয়ে সংসার পরিচালনা করেন। থাকেন পরিবার পরিজন নিয়ে যশোরে। সংসারের খরচ
জুগিয়ে দিনের আয় থেকে কিছু টাকা আলাদা করে বৃক্ষ রোপনের জন্য। অটোর পেছনে
বৃক্ষ রোপন মৌসুমে গাছের চারা, কোদাল ও সাবল রাখেন। যাত্রাবিরতির ফাঁকে রাস্তার
পাশে কিংবা কোনো পরিত্যক্ত জায়গা চোখে পড়লেই নেমে পড়েন সেখানে। কয়েক
মিনিটের মধ্যেই মাটি খুঁড়ে লাগিয়ে দেন গাছের চারা। এভাবেই গত দুই বছরে যশোর
জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দু’হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন তিনি। তার স্বপ্ন
একদিন এক লাখ গাছ লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাবেন সুন্দর একটি
সবুজায়ন দৃশ্য।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা শান্তর জীবন সংগ্রামের গল্পও কম
কঠিন নয়। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মা গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি
সবার বড়। পরিবারের দায়িত্ব নিতে জীবিকার জন্য বেছে নেন অটো চালানোর পেশা।
বর্তমানে যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী, সন্তান, ছোট্ট ভাই ও
বাবা-মাকে নিয়ে থাকেন।
জীবিকার ব্যস্ততার মাঝেও পরিবেশ নিয়ে ভাবনাটা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। চারদিকে
নির্বিচারে গাছ কাটা, তীব্র গরম, কমে যাওয়া সবুজ আর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব
তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০২৪ সালে শুরু করেন বৃক্ষরোপণ।
কোনো সরকারি প্রকল্প, এনজিও কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না হয়েই নিজের
সামর্থ্যের মধ্যে গাছ কিনে লাগানো শুরু করেন তিনি। প্রথমে কয়েকটি গাছ, পরে তা
শত ছাড়িয়ে এখন পৌঁছেছে দু’হাজারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শান্তর অটো শুধু যাত্রি বহনের বাহন নয়। তাতে থাকে গাছের চারা ও
রোপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। যেখানেই খালি জায়গা বা রাস্তার পাশে উপযুক্ত স্থান
চোখে পড়ে, সেখানেই তিনি একটি চারা রোপণ করেন। শুধু লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ
করেন না, ওই পথে চলার মধ্যে গাছগুলোর অবস্থাও দেখে আসেন। কোথাও গাছ শুকিয়ে গেলে
নতুন চারা লাগানোরও চেষ্টা করেন।
কেশবপুরের মধ্যকুল এলাকায় গাছ লাগানোর সময় ২৬ বছর বয়েসী শান্ত বলেন, “আমি
ছোটবেলা থেকেই গাছ ভালোবাসি। কিন্তু গত কয়েক বছরে যেভাবে গাছ কাটা
বেড়েছে, তাতে মনে হয়েছে শুধু আফসোস করলে হবে না, নিজের জায়গা থেকে কিছু
করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, আজ একটি গাছ লাগানো মানে আগামী প্রজন্মের
জন্য নিরাপদ নিঃশ্বাস নিশ্চিত করার চেষ্টা। তাই যশোরের ৮টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে এক
লাখ গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন গড়ে তুলব।” নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়েই গাছের চারা
কিনি। তার কথা, “অটোর আয় খুব বেশি নয়। তবু সংসারের খরচ মিটিয়ে কিছু
টাকা গাছের জন্য রাখি।”
শান্তর ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ রোপণের ঘটনা দেখে পথচারীরাও মুগ্ধ। বৃহস্পতিবার গাছ
রোপনের সময় ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা গ্রামের
রফিকুল ইসলাম বলেন, অটো চালকের ব্যতিক্রম উদ্যোগ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। পরিবেশ রক্ষায়
তার এ কাজ ইতিবাচক সাড়া। এ ব্যাপারে কেশবপুর উপজেলা বন বিভাগ কর্মকর্তা সমিরন বিশ্বাস বলেন, নাজমুল
হাসান শান্তর জেলা ব্যাপী বৃক্ষ রোপনের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছি। ব্যক্তিগত ভাবে
কেউ সবুজায়নের লক্ষে গাছ লাগালে তাকে উৎসাহীত করা উচিৎ। তার ওই উদ্যোগকে
সাধুবাদ জানাই।














