খুলনা প্রতিনিধি : খুলনা নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৯টি পুকুরের উন্নয়নকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে পুকুর খনন, পানি পরিবর্তন, হাঁটার পথ, ঘাট, ধারণকারী দেয়াল, বসার স্থান ও শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুকুরের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর তুলনায় সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কেসিসির এই উদ্যোগের লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নগরের জলাবদ্ধতা কমানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের কত অংশ পুকুর খনন ও পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং কত অংশ সৌন্দর্যবর্ধনমূলক স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে উন্নয়নকাজের জন্য নির্বাচিত পুকুরগুলো হলো:
১. সরকারি বিএল কলেজ পুকুর ২. হরাইজন কলোনি পুকুর ৩. লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পুকুর ৪. মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর ৫. তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদরাসা পুকুর ৬. তালতলা হাসপাতাল পুকুর ৭. ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক পুকুর ৮. ১৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিস পুকুর ৯. মহাশ ট্যাংক পুকুর
কেসিসির তথ্য অনুযায়ী, ‘খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২)’ প্রকল্পের আওতায় প্রথমে ২৩টি পুকুর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় প্রথম পর্যায়ে ২৩টির পরিবর্তে ৯টি পুকুরের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ডিপিপি সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে বাকি পুকুরগুলোর উন্নয়নকাজ করার কথা রয়েছে।
এর আগে নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল কেসিসি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার জানান, পুকুরগুলোর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে।
পুকুর সংস্কার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে। তবে তাঁদের মতে, সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি পুকুরের মূল কার্যকারিতা, পানি সংরক্ষণ এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ বলেন, পুকুরটির বর্তমান অবস্থা ভালো এবং পানিও সুন্দর। মাদরাসার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুকুরটি বিদ্যমান অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্পাসের পুকুর ও খেলার মাঠ অক্ষুণ্ণ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া কেসিসিকে তাদের শর্ত অনুযায়ী কাজ করার জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হযরত আলী বলেন, পুকুরটি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের গোসল এবং মসজিদের মুসল্লিদের অজুর কাজে ব্যবহৃত হয়। সংস্কারের পর পুকুরটির পরিবেশ আরও পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
তিনি বলেন, উন্নত ঘাট, অজু ও গোসলের জন্য পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা এবং পুকুরের পাড় সংস্কার করা হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী ও মুসল্লিরা উপকৃত হবেন। তবে সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পুকুরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সহজ হবে এবং পুকুরগুলো দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
ট্যাংক রোড পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের পানি স্বচ্ছ নয়। শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার শেখানোর জন্য পানি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
খুলনায় সাঁতার প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা সুইমিং পুল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুকুরগুলোতে সাঁতার শেখার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা গেলে শিশুরা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি পুকুরগুলোর প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা দরকার।
খুলনা নগরীতে জলাশয় সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) জরিপে। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি জলাশয়ের মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়েছে। আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, ১৮টি পুকুর যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে কিছুটা ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও এসব জলাশয় সহায়ক হতে পারে।
তাঁর মতে, খুলনা নগরে প্রতিবছর তাপমাত্রা বাড়ছে বা অতিরিক্ত তাপ অনুভূত হচ্ছে। পুকুরগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
পুকুর সংস্কারের সময় পাড় ও আশপাশে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক সালাউদ্দীন। তাঁর মতে, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে পুকুরের চারপাশে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার করা হলে পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হতে পারে।
কংক্রিটের পরিবর্তে ছিদ্রযুক্ত বা পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে—এমন ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এতে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং জলাশয় সংরক্ষণের পরিবেশগত কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
অধ্যাপক সালাউদ্দীন বলেন, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক এবং নগরের জলাধার বা ‘ব্লু-স্কেপ’ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব স্থানে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
কেসিসির প্রকল্প পরিচালক আবির উল জব্বার জানান, ১৮টি পুকুরের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় পুকুর খনন, পানি পরিবর্তন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার ও ঘাটলা নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পুকুরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
কেসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য শুধু পুকুরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও এসব জলাশয় ভূমিকা রাখবে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে কেসিসির আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারি পুকুর পুনঃসংস্কারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনার কথা জানান। একই বছরের সেপ্টেম্বরে কেসিসির এক প্রকল্প অবহিতকরণ সভায় নগরের পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
খুলনা নগরের জলাশয় কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে পুকুর সংরক্ষণ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রকল্পের পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে পুকুরের গভীরতা, পানি ধারণক্ষমতা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে পুকুর খনন, গভীরতা বৃদ্ধি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা ব্যয় হবে, আর হাঁটার পথ, ঘাট, ধারণকারী দেয়াল, শৌচাগার ও অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ রয়েছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পের ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব, সংস্কারের আগে ও পরের পুকুরের গভীরতা এবং পানি ধারণক্ষমতার তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকল্পটির প্রকৃত অগ্রাধিকার ও পরিবেশগত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।














